বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

ইলিয়াসের মুক্তি পর্যন্ত হরতাল কেন চলতেই থাকবে



সি রা জু র র হ মা ন
এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যা ও গুম করার ঘটনাগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীগুলোর কোনো কোনোটি জড়িত। বিএনপি নেতা এবং ভারতের পানি আগ্রাসন, বিশেষ করে টিপাইমুখে ভারতের বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ সংগ্রামী ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া নিয়ে সরকারের সমর্থক পত্রিকাগুলোতেও যাঁরা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিচ্ছেন তাঁরাও নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। এটাও সন্দেহাতীত প্রমাণ করে যে অন্তত একটি তথাকথিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী এই গুম করার ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ সেটা বিশ্বাস করতে চান না। একটা কারণ তাঁরা আওয়ামী লীগের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বড় কারণটা এই যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যা যা ঘটেছে সেটা তাঁদের জানতে দেয়া হয়নি। ‘সঠিক ইতিহাসের’ নামে তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত ইতিহাস শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘লাল ঘোড়া দাবড়াইয়া দিব।’ প্রকৃতই লাল ঘোড়া, অর্থাত্ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থককে তখন আওয়ামী লীগের ঘাতক রক্ষীবাহিনী গুম ও হত্যা করেছিল। নিহতদের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার। রক্ষীবাহিনী সে তিন-সাড়ে তিন বছরে মোট ৪০ হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। জাসদের বর্তমান নেতা হাসানুল হক ইনুকে এককালে আমি চিনতাম ও শ্রদ্ধা করতাম। তিনি কী করে হত্যার রাজনীতির হোতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারেন ভেবে আমি সত্যি অবাক হই।
সুদূর বিদেশ থেকে অনলাইন লেখা পড়ে যতদূর বুঝতে পারি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকাটি সরকারবিরোধী নয়। এ পত্রিকায় একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের বয়ান ছাপা হয়েছে। তিনি ছিনতাইয়ের ঘটনাকালে ছিনতাইকারীদের একজনের শার্টের কলার চেপে ধরেছিলেন। সে লোকটি তার আইডি কার্ড দেখিয়ে দাবি করে যে সে একটি নিরাপত্তা বাহিনীর (র্যাবের কি?) লোক এবং তারা একটা অপারেশন চালাচ্ছে। একজন ডাব-বিক্রেতাও ঘটনাটি দেখেছিলেন। এখন তাঁরা কোথায়? ইলিয়াস আলী আওয়ামী লীগের চিহ্নিত শত্রু। বৃহত্তর সিলেটে তিনি বিএনপির সংগঠনের কাজ এতদূর এগিয়ে নিয়েছিলেন যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সেখানে আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারতেরও তিনি চক্ষুশূল। টিপাইমুখে বাঁধ তৈরির প্রতিবাদে সবচাইতে সোচ্চার প্রতিবাদ তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রমাণ নষ্ট করা ছাড়া তাঁর ড্রাইভারকেও গুম করার অন্য কী কারণ থাকতে পারে?
অথবা দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকাল। যতদূর বুঝতে পারি এ দুটি পত্রিকা সরকার ও আওয়ামী লীগের সমর্থক। উভয় পত্রিকাই খবর ছেপেছিল যে ইলিয়াস আলীকে জীবন্ত মুক্তিদানের জন্য দশটি শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল যে মুক্তি পেলে ইলিয়াস আলীকে সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঘোষণা করতে হবে যে বিএনপি নেত্রীর নির্দেশে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অন্তর্ধানের যে কারণটি নির্দেশ করেছিলেন) এবং ইলিয়াস আলীকে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবে। ইলিয়াস আলীকে কে বা কারা কী কারণে রাজনীতির ময়দান থেকে সরিয়ে দিয়েছে সে সম্বন্ধে এখনও কি কারও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে?
সাহারা ঘাতক বাহিনীকে লেলিয়ে দিচ্ছেন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন গত শনিবার ১৮ দলের জোটের দ্বিতীয় দফা হরতাল ঘোষণার পর বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা একা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়; হরতাল প্রতিহত করতে তিনি আওয়ামী লীগ কর্মীদেরও মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। গত সাড়ে তিন বছরে পুলিশ বাহিনীর কলেবর বিরাট বৃদ্ধি করা হয়েছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের বহু সদস্যকেও এ বাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতির একটা বড় যোগ্যতা। গত বছরের ৬ জুলাই সংসদ ভবনের চত্বরে বিএনপির প্রধান হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে অমানুষিক পেটানোর জন্য দায়ী মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনারকে গত কয়দিনে পদোন্নতি দিয়ে একটি জেলার পুলিশ সুপার করা হয়েছে।
তাছাড়া সরকারের র্যাব বাহিনী তো আছেই। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর পক্ষে কেন আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়? অনেক কারণ আছে তার। একটা কারণ এই যে, এই বাহিনীগুলোকে এখন গণবিরোধী ভূমিকায় নামানো হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার দলন এং গণতন্ত্র হত্যা কখনোই পুলিশের ভূমিকা হওয়া উচিত নয়। ব্রিটিশরা এবং পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরতন্ত্রও বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রস্পৃহাকে হত্যা করতে পারেনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও গত সাড়ে তিন বছরে তাদের ফ্যাসিস্ট পদ্ধতি দিয়ে দেশের মানুষের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি। পুলিশকে অনৈতিক কাজ করতে বলা হলে তারা কখনোই সে কাজে সফল হতে পারবে না।
আরেকটা কারণ এই যে র্যাব ও পুলিশকে সরকারের প্রতিপক্ষের গণতন্ত্রের আন্দোলন নির্মূল করার কাজে এতই ব্যস্ত রাখা হচ্ছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সময় তারা পায় না। দেশের সব মানুষ এখন বিশ্বাস করে যে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের খুন ও গুম করার জন্য মূলত র্যাব দায়ী। এ সরকারের সূচনা থেকেই ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবং শেখ হাসিনার সশস্ত্র ক্যাডাররা বিরোধী দলের আন্দোলন-হরতালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে এই হানাদারদের সংরক্ষণ দিতেই বেশি ব্যস্ত। ইলিয়াস আলীকে গুম করার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বনাথে প্রতিবাদ বিক্ষোভে গুলিবর্ষণে তিনজন মারা গেছে। জানা গেছে, ময়না তদন্তে দেখা গেছে যে, যে ধরনের গুলিতে তারা নিহত হয়েছে সে ধরনের অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশ পুলিশের কাছে নেই।
গৃহযুদ্ধের উস্কানি?
এ ব্যাপারটা কোনো কোনো ভারতীয় পত্রপত্রিকার খবর উল্লেখ করে শ্রীলঙ্কার একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের বিশ্বাসযোগ্যতাই তুলে ধরে। সে খবরে বলা হয়েছে যে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে ক্রুসেডার নামে পরিচিত ১০০ জন আওয়ামী লীগ ঘাতককে ভারতের দেরাদুন মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এ খবরটি দুটি কারণে বিশেষ উদ্বেগের কারণ। প্রথমত, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ও অস্ত্র সরবরাহ করে ভারত আমাদের দেশে একটা গৃহযুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ক্রুসেডের বিশেষ একটা সংশ্লেষ আছে। ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় রোমান ক্যাথলিক রাজারা জেরুসালেম দখল এবং মুসলিম আধিপত্য বিনষ্ট করার জন্য এই ক্রুসেড চালিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের যেসব কর্মীকে দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ তারা কি তাহলে বাংলাদেশে ইসলামকে ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ পেয়ে এসেছে? এখন এ সন্দেহ করার বিশেষ কারণ ঘটেছে, বিশ্বনাথে তিন ব্যক্তিকে যে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সে অস্ত্র নব্য ক্রুসেডাররা ভারতের কাছ থেকেই পেয়েছে। সাহারা খাতুন কি হরতাল ঠেকানোর নামে বিরোধী ১৮ দলের নেতাকর্মীদের রক্তপাতের নির্দেশই দিয়েছেন আওয়ামী লীগ কর্মীদের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্রুসেডারদের?
আমরা আগেও বহুবার বলেছি যে হরতাল জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু হরতাল কথাটা রাজনীতির অভিধানে ঐতিহাসিক কাল থেকেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা গোড়া থেকেই স্বীকার করেছেন, হরতাল রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম নয়, সর্বশেষ হাতিয়ার হওয়া উচিত। অর্থাত্ অন্য সব পন্থায় গণতন্ত্র রক্ষা করা না গেলে শেষ চেষ্টা হিসেবে হরতালকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত। আমরা মনে করি বাংলাদেশে এখন সে অবস্থাই এসে গেছে। একটা ফ্যাসিস্ট সরকার একটা সম্প্রসারণকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় গণতন্ত্র ধ্বংস করে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিটির পদাবনত একটা ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করতে চায়। আগেই বলেছি গণতন্ত্র বাংলাদেশের মানুষের মজ্জাগত। গণতন্ত্র রক্ষায় তাদের আত্মদানের ইতিহাস নতুন নয়। শেখ হাসিনার সরকার গত সাড়ে তিন বছরে বহু হাজার হত্যা ঘটিয়েছে। গুম করার ‘ঐতিহ্য‘ তারা স্থাপন করেছিল রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর কর্মীদের দিয়ে।
বিরোধী দলগুলো গোড়ায় সেটা নীরবে সহ্য করে গেছে। আস্কারা পেয়ে ঘাতকরা এখন অনেক ওপরে হাত বাড়াতে শুরু করেছে। ইলিয়াস আলী তার প্রমাণ। বিরোধী নেতারাও এখন শঙ্কিত। সমানেই শঙ্কিত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন বলেছেন তিনি নিজেও গুম হওয়ার ভয়ে শঙ্কিত। তারপরেও শাসক দলের জোটে অন্তর্ভুক্ত থাকতে কেন তাঁর গা-ঘিন ঘিন করে না ভাবছি।
দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ
দেশে এখন একটা ত্রাসের রাজত্ব চলছে। এ অবস্থায় কারোরই নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সেজন্যই ১৮ দলের জোটের নেতারা অবশেষে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। হরতাল সেজন্যই। তাঁরা বুঝে গেছেন এখন প্রতিরোধ করা না হলে চিরস্থায়ী ক্ষমতা তাদের হাতে চলে যাবে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দেয়ার কাজ শুরু করেছে সাড়ে তিন বছর আগে থেকেই। অর্থাত্ ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবিতে যে হরতাল ও আন্দোলন হচ্ছে সে আন্দোলন আর সে হরতাল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনও বটে। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগের হিসাব করেনি। তারা স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বর্তমানেও তাদের মনে করতে হবে যে তারা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে নেমেছে, ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব করার সময় এখন নয়।
বিএনপি দ্বিতীয় দফায় রবি ও সোমবার হরতাল ডেকেছে। বিরোধী ১৮ দলের জোট বলেছে, সোমবারের মধ্যে ইলিয়াস আলীকে মুক্তি দেয়া না হলে মঙ্গলবার মে দিবস বাদ দিয়ে আবারও হরতাল ডাকবে তারা। আগামী সপ্তাহের শনিবার ৫ মে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতের অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশে আসছেন। ১৮ দল বলেছে যে তাঁদের সফরের দিন তারা হরতাল করবে না। বিদেশি ভিআইপিদের প্রতি সৌজন্য স্বরূপ তাঁদের উপস্থিতিতে হরতাল না করা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। কূটনৈতিক মহলে বলাবলি হচ্ছে আগামী বছরে সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে চলতি বছরের মধ্যেই মতৈক্য প্রতিষ্ঠায় এই দেশদুটি খুবই আগ্রহী।
খুবই ভালো কথা। কিন্তু ১৮ দলের জোটের নেতাদের কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ২০০৭ -২০০৮ সালে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে সে ব্যাপারে এ দুটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বীণা সিক্রি ও কালা জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টম্যাস মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনেও হোতা ছিলেন মনে করা হয়। অন্যথায় শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হতেন না, বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা নিয়েও এখন প্রশ্ন দেখা দিত না। প্রণব মুখার্জি আর হিলারি ক্লিনটনের চাপে ১৮ দলের জোট যদি তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির দাবি ত্যাগ করে তাহলে মারাত্মক ভুল করা হবে। একইসঙ্গে দুই বিদেশি মন্ত্রীর চাপে পড়ে ইলিয়াস আলীর মুক্তি ছাড়া হরতালের অস্ত্র ছেড়ে দিতে রাজি হলেও নেতারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবেন। খুব সম্ভবত সে ক্ষেত্রে জনতা তাঁদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি হবে না।
(লন্ডন, ৩০.০৪.১২)

বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১২

সুরঞ্জিতের পদত্যাগ ও পুনর্বহালের পেছনে বহু প্রশ্ন

সুরঞ্জিতের পদত্যাগ ও পুনর্বহালের পেছনে বহু প্রশ্ন


॥ সিরাজুর রহমান ॥

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন আর অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্ন একমত হয়েছেন যে জ্যেষ্ঠ ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের আয় আর তারা কত কর দিয়েছেন তার বিবরণ প্রকাশ হওয়া উচিত। ক্ষমতায় আসার দু’বছরের মাথায় তাদের এই স্বচ্ছতার সিদ্ধান্তের দুটো কারণ আছে। প্রথমত, অর্থমন্ত্রী গত ২১ মার্চের বাজেটে আয়করের স্তরভেদের যেসব বিধান করেছেন সে সম্বন্ধে এখনো তুমুল বিতর্ক চলছে। দ্বিতীয়ত, আগামী ৩ মে লন্ডনের মেয়র নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরেই এটা ব্রিটেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদ বলে বিবেচিত। বড় দুটো দলের প্রার্থীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। তার জের ধরে তারা এখন নিজ নিজ ট্যাক্স রিটার্নের বিবরণ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিকদের সম্পদের ব্যাপারে কিছুকাল অগ্রবর্তী ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি বলেছিলেন, তার দল জয়ী হলে মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হবে। সবাই এখন জানে শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতিগুলো অর্থহীন, নিছক রাজনীতির কলাকৌশল মাত্র। ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো, কৃষকদের বিনামূল্যে সার দেয়া, রাতারাতি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করে ফেলা ইত্যাদি আরো বহু প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন গদি পাওয়ার আশায়। গদি তিনি পেয়েছেন, কিন্তু কোন প্রতিশ্রুতিটি তিনি পালন করেছেন?
গদি লাভের তিন বছর পর শেখ হাসিনা মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাবের কথা উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু সে হিসাব প্রকাশের কথা তিনি আর বলেননি, শুধু বলেছেন মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব তার কাছে জমা দিতে হবে। ২০০৮ সালের প্রতিশ্রুতি আর ২০১১ সালের নির্দেশের মধ্যে এই আকাশ-পাতাল গরমিল কেন? এ সরকারের আমলে দেশজোড়া দুর্নীতি ১৯৭২-৭৫ সালের মহাদুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভর্তিবাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্য, নিয়োগবাণিজ্যÑ এগুলো কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। দুর্নীতি প্রমাণ করা কখনোই সহজ নয়। যারা দুর্নীতি করে তারা এত বোকা নয় যে সাক্ষী-প্রমাণ রেখে দুর্নীতি করবে। কিন্তু দেশের সব মানুষের উপলব্ধি এই যে দিনদুপুরে পুকুর চুরিই নয়, রীতিমতো দীঘি চুরি; এমনকি বঙ্গোপসাগর চুরিই চলছে এখন। নির্বাচন যখন হবে ভোটদাতারা তখন প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করবে না, উপলব্ধি থেকে তারা ভোট দেবে; উপলব্ধিই তাদের প্রার্থী এবং দল নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট হবে। 

ভেবে দেখুন! এ সরকার ক্ষমতা পাওয়ার পর লে. ক. ফারুক খান যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন চাল-ডাল-তেল-নুন-আটা থেকে শুরু করে পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কার দামেও যে ফটকাবাজি চলেছে, সেসব কথা বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যেতে পারবে? তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে যেসব সিন্ডিকেট আর গ্রুপকে ২০ হাজার কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট বিনা টেন্ডারে দেয়া হয়েছে এবং চুরির দায়দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়ার আগাম মুচলেকা দেয়া হয়েছে, তাদেরও কোনো কোনোটির মালিক সরকারের উচ্চপদে আসীনদের আত্মীয়স্বজন অথবা দলের ভেতর ক্ষমতার খুঁটি বলে বিবেচিত কয়েকজন।

আরো দেখুন! দেশের ৩২-৩৩ লাখ স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যেকোনো প্রকারেই হোক কিছু টাকা সংগ্রহ করে সুদিনের মুখ দেখার আশায় শেয়ারবাজারে লগ্নি করেছিল। সেসব টাকা কুমিরে খেয়েছে। তারা এখন পথে বসেছে, তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেছে। সরকারের ভেতরের কিছু লোক এবং সরকারের দেশী-বিদেশী পৃষ্ঠপোষকেরা এই ৩২-৩৩ লাখ লোকের যথাসর্বস্ব লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে বলেই সবার বিশ্বাস। সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটা জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটি নাম ধরে দুর্বৃত্তদের তালিকাও সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, এমনকি তস্করদের নামের তালিকা প্রকাশ করতেও তারা সাহস পায়নি। 

দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের এই অনীহা থেকে দেশের মানুষ ঠিকই বুঝে গেছে এ সরকার তাদের কল্যাণ সাধনের জন্য নয়, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতেই গদিতে এসেছে। আর হাসিনা কেন মন্ত্রীদের সম্পদের তালিকা চেয়েছেন? তারও কারণ আছে। সরকার এখন চতুর্থ বছরে পড়েছে। মন্ত্রীদের চাকরির মেয়াদ আর মাত্র দেড় বছর। আখের গুছিয়ে নিতে তাদের আর ধৈর্য সয় না। লুটপাটের ব্যাপারে তাদের কেউ কেউ বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে উচ্ছৃখলতা আর অবাধ্যতার ভাবও দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। মন্ত্রীদের দুর্নীতি আর টাকার পাহাড়ের খোঁজখবর হাতে থাকলে রাশ টেনে ধরতেও সেই হিসাবকে ব্যবহার করা যাবে।

মন্ত্রীদের পেট এখন অনেকটা ভরে এসেছে। এ দিকে নির্বাচনের সময়ও এগিয়ে আসছে দ্রুত। সংসদ সদস্যদের পেটও এখন ভরানো দরকার। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছাড়া আগামী নির্বাচনে ভোট পাওয়ার উপায় নেই। যেকোনো প্রকারেই হোক তাদের খুশি করা না গেলে তারা বহু হাঁড়ি হাটেই ভেঙে দেবেন, শেষমুহূর্তে হয়তো ভাঙা নৌকা থেকে লাফিয়ে অন্য দলে চলে যাবেন কেউ কেউ, যেমন করে ডুবন্ত জাহাজ কিংবা নৌকা থেকে ইঁদুর-ছুঁচো লাফিয়ে পড়ে। তাদের বেশ কয়েকজনকে এখন ব্যাংক করার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক করার পুঁজি তারা কোথায় পেলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান কি একবারও তার খোঁজ নিয়েছেন? জোর গুজব, ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার ব্যাপারে দেদার টাকার হাতবদল হয়েছে। রেডিও, টেলিভিশন, টেলিকম লাইসেন্সের ব্যাপারেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। শোনা যাচ্ছে নতুন নতুন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি খোলার জন্যও লাইসেন্স দেয়া হবে। সন্দেহ নেই যে সরকারের ভেতর মহলের কেউ কেউ আরো বহু কোটি টাকা হাতিয়ে নেবেন সেই সুবাদে।

দুর্নীতি তদন্তে সরকারের অনীহা
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বহু অভিযোগ মিডিয়ায়ও প্রচার হয়েছিল। এমনকি পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির প্রমাণও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তখনো আমরা বলেছিলাম, সৈয়দ আবুল হোসেনকে বরখাস্ত করার সাহস সরকারের হবে না। আসলেও হয়নি। একাধিক কারণ আছে তার। দেশে ব্যাপক সন্দেহ আছে, যেকোনো কারণেই হোক ‘ওপরের’ শক্তিশালী সমর্থন আছে আবুল হোসেনের পেছনে। প্রচার-প্রচারণায় কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার পর তাকে অন্য এমন একটি দফতরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি বৈ কম নয়। বিশ্বব্যাংক এখন কানাডার একটি নির্মাণ কোম্পানিকে দুর্নীতির দায়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজে অযোগ্য ঘোষণা করেছে। 
অনেক প্রবাদ আছে চোর ও চুরি সম্বন্ধে। একটা হচ্ছেÑ চোরেরও ধর্ম আছে। আরেকটা চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। আসল কথা হচ্ছে, এক চোর অন্য চোরকে ধরিয়ে দেয় না। এবং আগেই বলেছি চোরেরা সাক্ষী-প্রমাণ রেখে চুরি করতে চায় না। আরেকটা প্রবাদÑ চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দুর্ভাগ্য। তিনি ধরা পড়ে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বলেই সবার ধারণা। 
অত্যন্ত নাটকীয় কিছু ঘটনা ঘটেছে ৯ এপ্রিল দিবাগত শেষ রাতে। চলমান একখানি গাড়ি হঠাৎ করে মোড় নিয়ে পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বাহিনীর সদর দফতরে ঢুকে পড়ে। সেই গাড়ির আরোহীরা ছিলেন গাড়ির মালিক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ওমর ফারুক তালুকদার, বাংলাদেশ রেলের পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধা আর রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডেন্ট এনামুল হক। গাড়ির চালক ছিলেন আজম খান। পিলখানায় ঢুকেই আজম খান নাকি চিৎকার করে বলতে থাকেন গাড়িতে অনেক টাকা আছে। বিজিবির লোকেরা তল্লাশি করে নাকি ৭০ লাখ টাকা পান। এত রাতে তারা কোথায় যাচ্ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাবে ড্রাইভার ও যাত্রীরা সবাই বিজিবিকে বলেন যে তারা রেলমন্ত্রীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পরদিন মিডিয়াকেও তারা একই কথা বলেন। কিন্তু রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পরে দাবি করেন ওই তিনজন যাত্রী আজম খান চালিত গাড়িতে তার বাড়িতে যাচ্ছিলেন না, যাচ্ছিলেন তার একান্ত সচিব ওমর ফারুক তালুকদারের বাড়িতে।

সঠিক চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি
অনেক কারণে সেই রাতের ঘটনাবলির একটা স্বচ্ছ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধা বলেছিলেন, একটা স্টেশনে (শায়েস্তাগঞ্জ?) ট্রেন থামবে কি না আলোচনার জন্য তিনি রেলমন্ত্রীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। তাহলে গাড়িতে যে বস্তা বস্তা টাকা ছিল তার ব্যাখ্যা কী? একটা কথা তখনো শোনা গিয়েছিল গাড়িতে ৭০ লাখ নয়, চার কোটি ৭০ লাখ টাকা ছিল। অবশিষ্ট চার কোটি টাকা তাহলে গেল কোথায়? চার কোটি ৭০ লাখ অঙ্কটার কিছু প্রাসঙ্গিকতা আছে। মোটামুটি একই সময়ে খবর পাওয়া যায়, সুরঞ্জিতের পুত্র সৌমেন পাঁচ কোটি টাকায় একটা টেলিকম লাইসেন্স কিনেছেন। তার টাকার উৎসই বা কী? আরেকটা প্রশ্ন : ড্রাইভার আজম খান কি টাকার বখরার কারণে পিলখানায় ঢুকে পড়েছিলেন, নাকি দুর্নীতি দমনের নাগরিক দায়িত্ব থেকে যাত্রীদের তিনি বিজিবির হাতে ধরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? শোনা যাচ্ছে আজম খানকে এখন পাওয়া যাচ্ছে না, তার পরিবার তার নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন। কোথায়, কেমন আছেন আজম খান?
গা বাঁচানোর জন্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চেষ্টাগুলো প্যাথেটিক। মূল অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। নিজেকে নির্দোষ সাব্যস্ত করতে তিনি দুটো ‘এক ব্যক্তির’ তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন তারই অধীনস্থ দু’জন কর্মকর্তার অধীনে। এপিএস ফারুক সম্বন্ধে তদন্তের ভার দেয়া হয়েছিল তারই সহকর্মী পিএস (একান্ত সচিব) আখতারুজ্জামানকে। আর জেনারেল ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় রেল মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব শশী কুমার সিংকে, যিনি মোটামুটি জেনারেল ম্যানেজারের সমমর্যাদার কর্মকর্তা। বর্তমান সরকারের আমলে ‘তদন্ত’ ব্যাপারটাই মূল্যহীন। কোনো তদন্তেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয় না। 

সাংবাদিক দম্পতি মেহেরুন রুনি আর তার স্বামী সাগরের হত্যার তদন্ত তদারকির ভার নিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সেই হত্যারও কোনো সুরাহা হয়নি। শোনা গিয়েছিল বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কন্ট্রাক্টে ব্যাপক দুর্নীতি সম্বন্ধে তারা তদন্ত করছিলেন। আরো শোনা গিয়েছিল যে খুনিদের তাড়াতাড়ি আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের সাড়ে তিন বছরে দুর্নীতি দমন কমিশন শাসক দলের কাউকে দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি। এ সরকারের আমলে তদন্তের অন্য অর্থ হচ্ছে সময়ক্ষেপণ এবং সত্য উদঘাটন না হওয়া।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করতে অস্বীকার করছিলেন। রাতের বেলায় প্রধানমন্ত্রী তাকে তলব করার পরের দিন সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় এই প্রথমবার একজন মন্ত্রী বরখাস্ত হলেন। শেখ হাসিনার অনুগত রাজনীতিক ও লেখকেরা চমৎকৃত হয়েছেন তাতে। সরকারের গৃহপালিত মিডিয়া এই পদত্যাগকে পুঁজি করে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ ঘষামাজা করার কাজে লেগে গেছে। এখানে প্রধানমন্ত্রীর নবজাগ্রত কোনো শুভবুদ্ধির পরিচয় আমি দেখতে পাই না। প্রকৃত ব্যাপার এই, সরকারের মধ্যে দুর্নীতির একটা সিন্ডিকেট আছে। ধারণা করা হয়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ধরা পড়ে গিয়ে গোটা সিন্ডিকেটকেই বিপদগ্রস্ত করেছেন। 
গত সাড়ে তিন বছরে রেলওয়ে বিভাগে সাড়ে সাত হাজার জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। রেল কর্মচারী, ইউনিয়ন সদস্য ও নেতা এবং চাকরিপ্রার্থীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, প্রতিটি নিয়োগের বেলায় নিয়োগকর্তারা দুই থেকে চার লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এই নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগ তারা কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। কেন হয়নি এখন আর কারো বুঝতে বাকি রইল না। 

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম
মিডিয়ায় এবং অন্যত্র তার পদত্যাগের দাবিকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন। সুরঞ্জিত বাবু বিরোধী দলের বিরুদ্ধে গা ঘিনঘিন করা দাঁত খিঁচানো ব্যঙ্গ দিয়ে এতকাল শুধু নিজেকেই আমোদিত করছিলেন। তার এই দাবিতে বহু মহলেই বিদ্রƒপের হাসি দেখা দেবে। এ সরকারের কাজে এবং কর্মে সুরঞ্জিত বাবু গণতন্ত্র কোথায় দেখলেন? কোন গণতন্ত্রের কথা বলছেন তিনি? ক্ষমতা পাওয়ার প্রথম দিন থেকে এ সরকার গদি চিরস্থায়ী করার জন্য ফ্যাসিস্ট পন্থায় সব রাজনৈতিক বিরোধিতাকে নির্মূল করার পরিকল্পিত অভিযান শুরু করেছে। 
হত্যা, ধরপাকড় এখনো অব্যাহত গতিতে চলছে। জেলখানায় এদের স্থান করার জন্য ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের মুক্তি দিচ্ছে সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যার সাথে ইদানীং যুক্ত হয়েছে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুম করে ফেলা। ঢাকার কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে দিয়ে এই গুম করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সর্বশেষ গুম হয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য, সিলেট জেলা বিএনপির প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। দেশব্যাপী জোর গুজব এবং বিএনপি সরাসরি অভিযোগ করেছে যে সরকারই বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে।
বিরোধী দলকে সভা-সমিতি ও মিছিল করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। গত ১২ মার্চ বিএনপির আহূত ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি বানচাল করতে সরকার যা করেছে সেটা রীতিমতো ন্যক্কারজনক। প্রধান বিরোধী দলের সদর দফতরকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখার দৃষ্টান্ত সম্ভবত নাৎসিরাও দেখাতে পারেনি। প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। এই তিনটি বিভাগকে বিরোধী দলের নির্যাতনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ সরকারের আমলে যে ক’টি মেয়র নির্বাচন হয়েছে প্রতিটিতে সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। রাজধানীতে পরাজয়ের গ্লানি এড়ানোর জন্য এখানের মেয়র নির্বাচন সরকার তিন বছর ঠেকিয়ে রেখেছিল। রাজধানীকে দুই টুকরো করে নির্বাচন আবারো পেছানো হয়েছে। তার পরও নির্বাচন কমিশন বিভক্ত ঢাকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল। আসন্ন নির্বাচন আরো তিন মাসের জন্য মুলতবি করেছেন আদালত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কটূক্তি করে বিরোধী দলের সংসদে উপস্থিতি অসম্ভব করে তুলেছেন। সুরঞ্জিত স্বয়ং যে ভাষায় বিরোধী দলকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছেন সেটাকেও গণতন্ত্রের ভাষা বলা যায় না। এই যদি গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হয় তাহলে সেই গণতন্ত্র কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষের কাম্য হতে পারে না। 

ভারতের চাপে সুরঞ্জিত আবার মন্ত্রী
পদত্যাগ করেও মাত্র ৩০ ঘণ্টা পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবার ক্যাবিনেটে স্থান পেয়েছেন দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে। তার পদত্যাগে সরকারের ইমেজ বেড়েছে বলে যেসব পত্রিকা নাচানাচি করছিল তারা এখন কী ব্যাখ্যা দেবে? বরং এটাই মনে হয় যে এ সরকার আপন স্বার্থে আপনজনদের ক্ষমতা-বলয়ের বাইরে যেতে দেবে না। তাহলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কি ইতোমধ্যেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন? সত্যি সত্যি যদি তিনি নির্দোষ হন তাহলে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন কেন?
আসল ব্যাপার সেটা নয়। দেশব্যাপী জোর গুজব সুরঞ্জিতকে আবার মন্ত্রী করা হয়েছে ভারতের চাপে। আমরা আগেও অনেকবার লিখেছি, এ সরকারের আমলে বাংলাদেশে কী ঘটবে না ঘটবে সেটা স্থির হয় দিল্লিতে। আমরা বলেছি এবং বিশ্বব্যাপী আরো অনেকে বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিক তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। বর্তমান সরকার গায়ের জোরে প্রমাণ করতে চায় যে তিন মিলিয়ন, অর্থাৎ ৩০ লাখ নিহত হয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে। সঠিক সংখ্যা যা-ই হোক সে যুদ্ধে অজস্র প্রাণহানি হয়েছে। ভারতের অঙ্গুলি তাড়নে পরিচালিত হওয়ার জন্যই কি মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছিলেন? 
বাংলাদেশের মানুষ জানে বিনা মেঘে বজ্রপাত কিংবা বিনা আগুনে ধোঁয়া হয় না। তারা এই সরকারকে দুর্নীতিবাজ বলে ভাবতে শিখেছে। তারা ধরে নিয়েছিল যে সুরঞ্জিতের পদত্যাগের ফলে অন্তত একটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেল। তাদের বিভ্রান্ত করার জন্যও শ্রী সেনগুপ্তকে আবার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এত 
বোকা নয়। এত সহজে তাদের সাথে প্রতারণা করা যাবে না। 
(লন্ডন, ১৮.০৪.১২) 
serajurrahman@btinternet.com

মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১২

জার্মান সমরবাদের ভূত এখন ইসরাইলের কাঁধে : গুন্টার গ্রাস


সি রা জু র র হ মা ন


গুন্টার গ্রাস কৈশোরে জার্মানির আর-আর কিশোরদের মতোই হিটলারের কুখ্যাত এসএস বাহিনীর যুব শাখায় যোগ দিয়েছিলেন। নািসবাদের স্বরূপ এবং তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ভেতর থেকে দেখার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে তাঁর কবিতা ও রচনায় সে ফ্যাসিবাদের প্রতি ঘৃণা মূর্ত হয়ে উঠেছে। সেজন্যই তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ‘জার্মানির বিবেক’ বলে বর্ণিত।
হিটলার ইউরোপের ওপর এবং তার জের ধরে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন তাতে ১০ কোটি লোক মারা গেছে বলে অনুমান করা হয়। জায়নিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তখন থেকেই দাবি করে আসছে যে, নািসরা ছয় মিলিয়ন (৬০ লাখ) ইহুদিকে হত্যা করেছিল। তখন থেকে বিশ্বে আধিপত্যবাদী জায়নিস্টরা তাদের ৬০ লাখ নিয়ে এমনই প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে যে, সেই যুদ্ধে নিহত অবশিষ্ট প্রায় সাড়ে নয় কোটির কথা বিশ্ববাসী ভুলেই গেছে বলা চলে।
ইহুদিদের হিটলারের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’ পাঠানোর ব্যাপারে ফ্রান্সসহ কোনো কোনো দেশ নািসদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলো। ব্রিটেনসহ অন্য দেশগুলো নািসবাদের বিবর্তন ও ইহুদি নির্যাতন দেখেও দেখেনি। বস্তুত জার্মানি যখন চেকস্লোভাকিয়া আক্রমণ করে তার আগে পর্যন্ত ব্রিটেনও হিটলারকে তোষণ করেছে। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের আগে ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।
যুদ্ধের পর থেকেই বিশ্ব আধিপত্যবাদী জায়নিস্টরা হিটলারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য ইউরোপের দেশগুলোর কাছ থেকে খুবই উচ্চমূল্য আদায় করতে শুরু করে। গোড়াতেই সব ব্যাপারে ইহুদিদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এ মহাদেশে যেন রাষ্ট্রধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। ইহুদি-বিদ্বেষকে দণ্ডনীয় অপরাধ করা হয় প্রায় সব ইউরোপীয় দেশে। ইউরোপ-আমেরিকার বাধ্যতামূলক সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ইহুদিরা ফিলিস্তিনি আরবদের (মুসলিম ও খ্রিস্টান) ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য যে পরিমাণ ভূমি নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো, আজকের ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তন তার প্রায় তিনগুণ। প্রথমেই ইরগুন, স্টার্ন গ্যাং প্রভৃতি মূলত পোলিশ ইহুদি সন্ত্রাসীরা প্রায় আট হাজার বর্ধিত আরব পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের ভিটেবাড়ি ও আবাদি জমি দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের অবশিষ্টাংশও দখল করে। জাতিসংঘ তখন থেকে এই দখল করা আরব ভূমি ছেড়ে যাওয়ার জন্য ইসরাইলকে নির্দেশ দিয়ে বহু প্রস্তাব পাস করেছে, কিন্তু আরবদের ভিটেবাড়ি, আবাদি জমি ও ফলের বাগান উচ্ছেদ করে ইহুদি বসতি নির্মাণ অবিরাম চলছে। জাতিসংঘ অনেক প্রস্তাব পাস করে এসব বসতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
এসব প্রস্তাব কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না এ কারণে যে, ইসরাইলকে বাধ্য করার কোনো প্রস্তাবে সম্মতি দিতে ইউরোপের দেশগুলোকে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানো যাচ্ছে না। জায়নিস্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ইহুদিরা এসব দেশে সব গুরুত্বপূর্ণ পেশায় ঢুকে পড়েছে। ইউরোপের কোনো দেশে ইহুদিদের সংখ্যা তিন-চার শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু সেসব দেশের পার্লামেন্টে এবং সরকারে ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব আনুপাতিকভাবে বেশি। তেমনি এই দেশগুলোর অর্থনীতি এবং মিডিয়াকেও তারা মুঠোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি প্রভাব আরও প্রকট। ইহুদি ও ইসরাইলি লবিগুলোর অনুমোদন ছাড়া এখন মার্কিন কংগ্রেসে কোনো আইন পাস করা অথবা কোনো রাজনীতিকের কোনো গুরুত্বত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো কথা উঠলেই সারাবিশ্বের ইহুদিরা ‘অ্যান্টিসেমিটিজমের’ (ইহুদি-বিদ্বেষের) জিগির শুরু করে দেয়, নািসদের হাতে নিহত ৬০ লাখ ইহুদির কথা তুলে কান্না জুড়ে দেয়। অর্থাত্ ত্রিশের দশকে নািসদের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার দরুন জায়নিস্টরা এখনও পশ্চিমা বিশ্বকে জিম্মি করে রেখেছে, বাকি বিশ্বকেও ব্ল্যাকমেইল করে।
পশ্চিমা সাহায্যে ক্ষুদে হিটলার
ইহুদি-বিদ্বেষ নিষিদ্ধ করার পেছনে আদি যুক্তি ছিল নািসবাদের পুনরাবির্ভাব অসম্ভব করে তোলা। জার্মান ‘মিলিটারিজমের‘ (সামরিক মনোভাবের প্রাবল্য) কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দখলদার শক্তিগুলো (ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও ফ্রান্স) এ জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বহু নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালু করে। কিন্তু অন্যদিকে ‘শত্রু-পরিবেষ্টিত ইসরাইলের আত্মরক্ষার ‘অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক সাহায্য দান এবং সমরাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সাহায্যে ইসরাইল গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে। তার অস্ত্রভাণ্ডারে এখন ৪০০টি পারমাণবিক বোমা আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কবি গুন্টার গ্রাস এখন ফাঁস করে দিলেন যে, জার্মানিও ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে এবং বর্তমানে ইসরাইলের জন্য দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করছে।
অবিসংবাদিত সত্য এই যে, ইসরাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান সামরিক শক্তি। নিজেরও অত্যন্ত আধুনিক একটা যুদ্ধাস্ত্র তৈরির শিল্প সে গড়ে তুলেছে। ভারতসহ কোনো কোনো দেশ ইসরাইলের কাছ থেকে সমরাস্ত্র আমদানি করে। বস্তুত ভারতেও ইসরাইলের সহযোগিতায় একটা অস্ত্র নির্মাণশিল্প গড়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক পরাশক্তির অবস্থান স্থায়ী করতে তেলআবিব সর্বদা উদগ্রীব। এ অঞ্চলের অন্য কোন দেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠার চেষ্টা করলে ইসরাইল স্বয়ং কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সে দেশকে শক্তিহীন করে দেয়া তেলআবিবের পরিচিত কৌশল। ইসরাইল গোড়া থেকেই দাবি করে এসেছে, যে কেউ তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বিবেচনা করলে আগেই তাকে আক্রমণ করার অধিকার ইসরাইলের আছে। অর্থাত্ এক্ষেত্রে সে অভিযোগকারী, জজ ও জুরির ভূমিকা একাই পালন করছে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র তারপর অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি নীরবে তেলআবিবের সে অন্যায় আবদার মেনে নিয়েছে।
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সম্ভাবনা দেখা দেয় নতুন আদর্শে উজ্জীবিত ইরান ইসরাইলি আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনা ও অস্ত্র সাহায্যে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধ আট বছর ধরে চলে। কিন্তু সে সাদ্দামই যখন বাগদাদের উপকণ্ঠে অসিরাকে একটা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেন তখন ১৯৮১ সালে ইসরাইল ভোল-পাল্টানো মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহার করে কেন্দ্রটি উড়িয়ে দেয়।
আট বছরের যুদ্ধের পর ইরান সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ইরাক শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। তখন থেকে ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ প্রচার চালাতে থাকে, সাদ্দাম হোসেন গোপনে গণবিধ্বংসী (পারমাণবিক ও রাসায়নিক) অস্ত্র তৈরি করছেন। গোড়ায় ওয়াশিংটন কিংবা লন্ডন এসব প্রচারণায় বিশেষ কান দেয়নি। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (নাইন-ইলেভেন) নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে আল কায়েদা সন্ত্রাসের পর মার্কিন জনমত ভয়ঙ্কর রকম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে দাঁড়ায়। সে বছরের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ইসরাইল সাদ্দামের কল্পিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের স্তূপের প্রচারণা বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে মোসাদ এ মর্মে ভুয়া প্রমাণ দাঁড় করায় যে, সাদ্দাম হোসেন আল কায়েদাকে সাহায্য দিচ্ছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ার ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
ইরান ওদের লক্ষ্য কেন?
সাদ্দাম ও তার ছেলেদের হত্যা করা হয়েছে। ইরাক দেশটির ধ্বংস এতো ব্যাপক ও সাংঘাতিক হয়েছে যে, আগামী ৫০ বছরে এ দেশটির আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পাশের দেশ ইরানের বৈশিষ্ট্য তার উদ্ভাবনী প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রম। ইসরাইলি উস্কানিতে ইউরোপ-আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ সত্ত্বেও দেশটি আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, বিজ্ঞানে-প্রকৌশলে অনেক উন্নতি করেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে তার অগ্রগতিকে বন্ধুরা প্রশংসার আর শত্রুরা শঙ্কার চোখে দেখছে।
মার্কিন বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, ইরান এখনও পর্যন্ত ইউরেনিয়াম জ্বালানি সমৃদ্ধিকরণের কাজেই অগ্রগতি লাভ করেছে কিন্তু বোমা তৈরির কোনো চেষ্টা সে এখনও করেনি। ইরানের নেতারা বার বার বলছেন—তারা বোমা তৈরি করতে চান না; শুধু পারমাণবিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের উন্নত জ্বালানি তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। ইরানের জন্য সমস্যা এই যে, সর্বোচ্চ গ্রেডের ইউরেনিয়াম দিয়ে যেমন সফলভাবে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যায়, তেমনি সে ইউরেনিয়াম আবার বোমা তৈরির কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে—যদি সে প্রযুক্তি ইরান আয়ত্ত করতে পারে।
ইসরাইলি গোয়েন্দারা এটা প্রমাণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে যে, বোমা তৈরির প্রযুক্তি ইরান এরই মধ্যে আয়ত্ত করে ফেলেছে এবং আগামী ক’মাসের মধ্যেই তেহরান পারমাণবিক বোমার অধিকারী হবে। মার্কিন সরকারের মূল্যায়ন কিন্তু তেমন নয়। ইচ্ছা করলেও ইরান এত শিগগির বোমা তৈরি করতে পারবে বলে তারা মনে করে না। তা সত্ত্বেও তেলআবিব বোমা ফেলে ইরানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পীড়াপীড়ি, এমনকি ব্ল্যাকমেইল করারও চেষ্টা করছে। ইসরাইলিরা বলছে, ওয়াশিংটন কিছু না করলে তারা নিজেরাই কেন্দ্রগুলোর ওপর আক্রমণ চালাবে। তেমন অবস্থায় ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক, ওয়াশিংটনও সে যুদ্ধে না জড়িয়ে পারবে না। মোসাদের লোকেরা এরই মধ্যে ইরানের একাধিক স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এ পর্যন্ত তারা চার ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে খুনও করিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ওবামার হয়েছে মহাসমস্যা। যদিও তিনি মনে করেন না ইরানের বোমা তৈরির সময় আসন্ন, তবুও ইসরাইলের চাপ এড়িয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন। আর ৭ মাস পরই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওবামা আরও চার বছরের জন্য ক্ষমতা পেতে চান। ইসরাইলি লবিগুলোকে অসন্তুষ্ট করে নির্বাচিত হওয়া তার জন্য সহজ হবে না। অন্যদিকে ইরাক আর আফগানিস্তানে যুগপত্ যুদ্ধে মার্কিন অর্থনীতি কাবু হয়ে পড়েছে। এ দুটি দেশে ওয়াশিংটন যতদিন জড়িত, সেটা দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধের মোট মেয়াদের চেয়েও বেশি। মার্কিন ভোটদাতারা এখন যুদ্ধক্লান্ত।
সমরবাদের কথা পশ্চিমারা ভুলে গেছে
আগেই বলেছি, জার্মানিতে অ্যান্টিসেমিটিজম নির্মূল করতে গিয়ে আমেরিকা আর ইউরোপ জার্মান মিলিটারিজমের অভিশাপের কথা ভুলে গেছে। গুন্টার গ্রাস সম্প্রতি একটি জার্মান সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘যে কথা বলতেই হবে’ শীর্ষক কবিতায় সে কথাটা আবার বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন—‘যে যুদ্ধবাজ জার্মানিকে দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে লিপ্ত করেছে, সে ভূত এখন ইসরাইলের ঘাড়ে চেপেছে।’ নাম না করে তিনি বলেছেন, ইরান এখনও পারমাণবিক বোমা তৈরি করেনি, তবুুও তার ‘প্রথম আক্রমণের’ অধিকারের জোরে ইসরাইল ইরান আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে; অথচ ইসরাইল নিজেই গোপনে তৈরি করেছে সে বোমা।
গুন্টার গ্রাস ‘যে কথা বলতেই হবে’ কবিতায় লিখেছেন : ‘এতকাল কেন আমি নীরব আর আটকা পড়ে ছিলাম/এমন একটি বিষয়ে যেটা প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায়/আমরা যারা বেঁচে থাকব সে যুদ্ধের পরে/বড়জোর পাদটীকা হয়েই থাকব আমরা।’
‘প্রথমেই আক্রমণের কথিত অধিকার/ধ্বংস করে দিতে পারে ইরানি জাতিকে/যারা কে গলাবাজ আর সাজানো জলসার পদানত/কেননা তার অধীনে নাকি অ্যাটম বোমা তৈরির কাজ চলছে।’
‘তবু অন্য সে দেশটির নাম নিতে কেন আমার ভরসা হচ্ছে না/বহু বছর ধরে যারা অ্যাটম বোমা গোপন রেখেছে ও বাড়াচ্ছে/আর সবার নজরদারি আর তদারকির বাইরে।’ লিখেছেন গুন্টার গ্রাস।
যে ইহুদিরা একদা নির্যাতিত ছিল, তারা এখন নির্যাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইঙ্গিতে গুন্টার গ্রাস বলতে চেয়েছেন, জার্মান সমরবাদ প্রথমে ইউরোপে এবং তার জের ধরে বাকি বিশ্বে সর্বনাশ ডেকে এনেছিল, ইসরাইলি সমরবাদও তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ডেকে আনতে চায় এবং সে অশান্তি খুব সম্ভবত বৃহত্তর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
গুন্টার গ্রাস এতকাল ইসরাইলসহ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ছিলেন। বহুবার তিনি ইসরাইল সফরও করেছেন। কিন্তু ইসরাইলি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দিয়েছেন—তাকে আর ইসরাইলে আসতে দেয়া হবে না। বিশ্বব্যাপী ইসরাইলি লবিগুলো তার সমালোচনার প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে বলেই মনে হয়। এতকাল যিনি ‘হিরো’ ছিলেন, মাত্র একটি কবিতা লিখে তিনি জায়নিস্ট জগতে ‘ভিলেন’ হয়ে গেলেন।
কালো মেঘের রুপালি বর্ণচ্ছটার মতো একটা আশার আলো আছে জার্মান চিন্তানায়ক গুন্টার গ্রাসের এই সাময়িক বিপত্তির মধ্যে। ইসরাইল যে সত্যি সত্যি বিশ্বশান্তির প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে কথা এখন অনেকেই ভাবতে শুরু করবেন। গুন্টারের সাহিত্য অনেকেই পড়েননি কিন্তু তার এই বহু আলোচিত কবিতাটি বহু দেশে, বহু ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। (লন্ডন, পহেলা বৈশাখ, ১৪১৯)

serajurrahman@btinternet.com

প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা বাংলাদেশের জন্য নয়



২০১২-০৪-১৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দয়ার শরীর। তার দয়াদাক্ষিণ্য আর বদান্যতার তুলনা নেই। সমস্যা হচ্ছে সব বদান্যতাই তিনি রিজার্ভ রেখেছেন পাশের দেশের জন্য। নিজের দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তার যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।
বাংলাদেশ ধুঁকছে। মধ্যবিত্ত স্বভাবতই সুজন। উপোস থাকলেও ভিক্ষা করা তার ধাতে সইবে না। সস্তা বলে বাজারের সবচেয়ে খারাপ জিনিস কিনবে সে। যৎসামান্য সঞ্চয় অনেক আগেই বিক্রি করে খেয়েছে। সাততাড়াতাড়ি সমৃদ্ধির মুখ দেখার আশায় গ্রামের বাড়ির জমি এবং গিন্নির বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া গয়নাগাঁটি বিক্রি করে শেয়ারবাজারে লগ্নি করেছিল। সরকারি দলের তস্কররা সেটা লুটেপুটে খেয়েছে। ছেলেপুলে ছেঁড়া কাপড় পরে স্কুলে যায়। যাদের চাকরি আছে, তারা সম্বল মাত্র একজোড়া ট্রাউজার ধুয়ে বালিশের নিচে ভাঁজ করে রাখে। সকালবেলা সেটি পরে আপিসে যাবে।
কেউ কেউ এখনো ঘুষ-উৎকোচ আর দুর্নীতির পথে যাননি। সব মানুষই স্বভাবত দুর্নীতিপরায়ণ নয়। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে কেউ কেউ দুর্নীতির পথ ধরেছেন। ইংরেজি প্রবাদ অনুযায়ী ‘দুর্নীতিপরায়ণ সমাজ নৈতিক দেউলিয়া।’ ছেলেপুলের শুকনো মুখ দেখে কেউ কেউ নীতি-নৈতিকতার কাছ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন' তারাও ভালো নেই। অস্বাভাবিক ভ্যাপসা গরমে রাতে ঘুমুতে পারেন না। সিলিংয়ের পাখাটা চালাবেন কী করে? বিদ্যুতের লোডশেডিং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১৬ ঘণ্টা। শিশুদের স্কুলের পড়া পড়তে হয় টিমটিমে মোমবাতির আলোতে। এ অবস'া চলতে থাকলে তাদের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দেবে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একবার নয়, বহুবার বলেছেন যে, অর্থনীতি সঙ্কটে আছে। আরো বলেছেন, ব্যাপক দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন ও অর্থনীতির বিকাশ হতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন অন্য কথা। তিনি বলেন, অর্থনীতির কোনো সমস্যা নেই, অর্থনীতি ভালো অবস'ায় আছে। তাদের মধ্যে কে সত্য কথা বলছেন? কার কথা লোকে বিশ্বাস করবে?
মাঝে মাঝে কলে পানি থাকে না। অন্য সময়ে পাওয়া যায় দুর্গন্ধময় দূষিত পানি। বহু পরিবারে সবাই পেটের অসুখে ভুগছে। যারা মারা যাচ্ছে তাদের মধ্যে শিশুরাই বেশি। পানি ফুটিয়ে খাবে, তারও উপায় নেই। চুলায় গ্যাস নেই। গিন্নিকে শেষ রাতে উঠে সামান্য কিছু রান্না করে রাখতে হয়। ও সময়ে গ্যাস আসে। সেচের অভাবে ফসল কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্যের দাম তাতে বেড়ে যাবে। দুর্ভিক্ষ ঘটারও আশঙ্কা বাদ দেয়া যায় না। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, শিগগিরই তিনি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করে ফেলবেন। মানুষ দেখছে উল্টোটা। বিদ্যুৎসঙ্কট এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শোচনীয়। প্রধানমন্ত্রী সে দিন বলেছেন, ‘এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করলাম তা যেন চোখেই পড়ে না।’

বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্তরালে
মন্ত্রীরা বলেছিলেন, মানুষ বেশি করে, তিনবারের বদলে চারবেলা খাচ্ছে বলেই খাবারের দাম বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ তো আর খাবার জিনিস নয় যে, বেশি করে খাবে! আর মওজুদ করে রাখার সামগ্রীও নয় বিদ্যুৎ। তা হলে ‘এত বিদ্যুৎ’ গেল কোথায়? লোকে কিন' বলে অন্য কথা। আসলে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কতগুলো বাণিজ্যিক গ্রুপকে ২০ হাজার কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট দেয়া হয়েছে বিনা টেন্ডারে। জানা গেছে, এসব গ্রুপের কোনো কোনোটির মালিক প্রধানমন্ত্রীর কাছের আত্মীয়, অন্যরা আওয়ামী লীগের মহারথী। সরকারি কোষাগার ফতুর করে দেয়া সে টাকা এরাই লুটেপুটে খাচ্ছে। এদের জন্য মনে হয়, প্রধানমন্ত্রীর দয়ার সীমা নেই। আকাশচুম্বী দুর্নীতি চলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেলায়। জোর গুজব, এই দুর্নীতি সম্বন্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন বলেই সাংবাদিক দম্পতি মেহেরুন রুনি আর সাগর খুন হয়েছেন। খুনিদের গ্রেফতারে সরকারের অনীহা এসব গুজবকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। খুনিদের ধরার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে নিয়েছেন। তাতে ফল হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন চা-বিস্কুট খাইয়ে সাংবাদিকদের আর কত দিন শান্ত রাখবেন?
মজার ব্যাপার দেখুন! তিতাস নদীর স্রোত বন্ধ করে সে নদী আর শাখা নদী ও খালগুলোতে বাঁধ দেয়া হলো। কারণ? কারণ এই যে, ভারত আগরতলায় বড় আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা তৈরি করবে, সে কারখানার জন্য বিরাট আর ভারী যন্ত্রপাতি নিতে হবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। ১৩৪ চাকার বিশাল ট্রেইলারে করে সেসব যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন' বাংলাদেশের পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করা হয়নি। তারপর শোনা গেছে, বাংলাদেশ সে কারখানা চালু রাখার জন্য গ্যাস দেবে আর সে কারখানা থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেবে। সে রকম কারখানা কি বাংলাদেশে তৈরি করা সম্ভব ছিল না? বিশেষ করে জ্বালানি যখন দিতে হবে বাংলাদেশকে? একসময় বর্তমান বাংলাদেশ থেকে পাট নিয়ে ব্রিটেনের ডান্ডিতে চট তৈরি হতো, আর সে চটের থলির চালান যেত বাংলাদেশে। নব্য উপনিবেশবাদ দেখছি কি আমরা? 
ভারতের প্রতি হাসিনার ঔদার্যের অবধি নেই। সে দেশের উত্তর-পূর্বের সাতটি অঙ্গরাজ্য বঞ্চিত এবং ক্রুদ্ধ। পাকিস্তানি আমলে আমাদের যেমন বঞ্চিত ও শোষণ করা হয়েছে, তারাও অনুরূপ শোষণের শিকার হচ্ছে দিল্লির হাতে। তাদের রকমারি প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে পশ্চিম ভারতের কেরালা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও পাঞ্জাবকে শিল্পোন্নত করা হয়েছে। কিন' বিনিময়ে তারা পাচ্ছে যৎসামান্য। তারা এই শোষণযন্ত্র থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছে চার দশকেরও বেশি আগে। বস'ত তাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও পুরনো। 
ভারত সামরিক শক্তি দিয়ে (পাকিস্তানিদের মতো) ন্যায্য অভিযোগ ও অসন্তোষকে টুঁটি টিপে মারার চেষ্টা করছে। সে রাজ্যগুলোতে অস্ত্রশস্ত্র আর সৈন্য পাঠানোর সহজ পথ বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। ওদিকে অরুণাচলে বিস্তীর্ণ বিবদমান এলাকা দখলের জন্য চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাঁয়তারা হচ্ছে ভারতে। চীন যদি শিলিগুড়ি হয়ে সরু সংযোগ পথটি বন্ধ করে দেয় তাহলে উত্তর-পূবের সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তখন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ছাড়া এ রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের অন্য কোনো পথ থাকবে না।

যা যা দেয়া হচ্ছে ভারতকে
হয়তো সে জন্যই ‘বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শ’ দিয়ে ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করেছিল। হাসিনাও সুদে-আসলে সে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করেননি। এশিয়ান হাইওয়ে যাওয়ার কথা ছিল টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ চীন পর্যন্ত। কলমের এক টানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সে পরিকল্পনা উল্টে দিলেন; বললেন যে, এশিয়ান হাইওয়ে দুই শাখায় বিভক্ত হবে; একটি যাবে বুড়িমারী থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আসামে; আবার দ্বিতীয় শাখাও শেষ হবে আসামে গিয়ে, বেনাপোল থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। যেন বাংলাদেশের জন্য এশিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে আসামে গিয়েই।
হাসিনা দিল্লিতে গিয়েছিলেন ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। বাংলাদেশের মানুষ শুনেছে, সেখানে অনেক চুক্তি করে এসেছেন তিনি। কিন' চুক্তির বিষয়বস', এমনকি সংখ্যাও বাংলাদেশের মানুষকে জানতে দেয়া হয়নি, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদেরও নয়। ভবিষ্যতেও যাতে কেউ জানতে না পারে, তার ব্যবস'া করার জন্য সংবিধানও পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে সরেজমিন যা ঘটছে, তার থেকে কিছু আঁচ-অনুমান বাংলাদেশের মানুষ করতে পারছে, অনেক কিছু দেখছেও তারা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেল, সড়ক ও নদীপথে উত্তর-পূর্ব ভারতে যাওয়ার করিডোর এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর অবাধে ব্যবহারের অধিকার দিতে হাসিনা রাজি হয়ে এসেছেন। প্রয়োজনবোধে তিতাসের মতো অন্য নদীতেও তারা বাঁধ তৈরি করবে বৈকি! বিনিময়ে বাংলাদেশ কিছু পাবে না। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেছেন, ভারতের কাছে টাকা চাইলে আমরা অসভ্য হয়ে যাবো।’ ভারতের কাছ থেকে ‘বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শ‘ পাওয়ার এখতিয়ার শুধু শেখ হাসিনার।
কিছুকাল আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সফররত এক কর্মকর্তার কাছে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়। প্রমাণ হয় যে, সারা বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস'া তদারকির জন্য তিনি ড. ইউনূসকে উপযুক্ত ব্যক্তি মনে করেছিলেন। ড. ইউনূস বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতার (তার ও বাকি বিশ্বের জন্য) জন্য তিনি তাকে যথাযোগ্য ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। তবে ইউনূস বাংলাদেশের সেবা করাকেই শ্রেয় বিবেচনা করে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, বদান্যতার বেলায় বিদেশীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষপাতিত্ব। 
ইউনূসকে তিনি বাংলাদেশে তারই স'াপিত ও পরিচালিত গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার উপযুক্ত বিবেচনা করেননি। তাকে অত্যন্ত অশোভনভাবে নিজের গড়ে তোলা ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তখন শোনা গিয়েছিল, গ্রামীণফোনের ওপর প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর তার পৃষ্ঠপোষকদের কারো কারো লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের নতুন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে কমিটি গঠন করা হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সে কমিটির সদস্য হওয়ার জন্যও ইউনূসকে যোগ্য বিবেচনা করেন না। শেখ হাসিনা শাসিত বাংলাদেশে গ্রামের যোগী ভিখ্‌্ পাবে না। 

বিদেশে মর্যাদাহানি 
একটা কথা মনে রাখতে হবে, ড. ইউনূসের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর গাত্রদাহ শুরু হয় ইউনূস যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পান তখন থেকেই। শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার কর্মকর্তারা তার জন্য এক ডজনেরও বেশি ডক্টরেট খরিদ করেছিলেন। বর্তমান দফায় ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি তার জন্য একটা নোবেল পুরস্কার সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে কূটনীতিক পাঠিয়েছিলেন দেশে-বিদেশে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে তার পৈতৃক সম্পত্তি মনে করেন, তার মতে নোবেল পুরস্কারসহ এ দেশের প্রাপ্য সব কিছু তার নিজের হওয়া উচিত। অন্য কেউ বাংলাদেশের জন্য সম্মান নিয়ে এলে সেটাকে গৌরব ভাবতে তার কষ্ট হয়। ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তিতে নিজের মর্মবেদনা প্রধানমন্ত্রী এখনো ভুলতে পারেননি মনে হচ্ছে।
ইউনূসের প্রতি শেখ হাসিনার অন্যায্য আচরণ বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদায় যেন এক বোতল কালি ঢেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তিন নম্বর প্রধান কর্মকর্তা ওয়েন্ডি আর শেরম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ড. ইউনূসের প্রতি সরকারের আচরণ। অতি সত্বর গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগের তাগিদ দিয়েছেন শেরম্যান। ওয়াশিংটন স্পষ্টতই ভয় করছে, এই আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে শেয়াল-কুকুরে কামড়াকামড়ি হতে পারে। ইউনূসকে যথাযোগ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধও মিজ শেরম্যান প্রধানমন্ত্রীকে করে গেছেন বলে মনে করা হয়।
মিজ শেরম্যান প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে গোপন বৈঠকে আর যে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে মনে হয়, সেগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশে সব দলের যোগদানের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুনিশ্চিত করা। এটাও তিনি টের পেয়ে গেছেন যে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচন করলে তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। তেমন অবস'ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অথবা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশও স্বীকৃতি দিতে চাইবে না। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারকে এ বিষয়টা গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আগেও জানা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সম্বন্ধে ওয়াশিংটন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিএনপি ও সমমনা গণতান্ত্রিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকারে সরকার যেভাবে বাধা দিচ্ছে, সে বিষয়ে মার্কিন সরকারের অসন'ষ্টির কথাও ওয়েন্ডি শেরম্যান প্রধানমন্ত্রীকে বলে গেছেন। এই মার্কিন কর্মকর্তার সফরের কী প্রতিক্রিয়া হবে, সবাই সে দিকে দৃষ্টি রাখবে। 
লন্ডন, ০৮.০৪.১২
serajurrahman@btinternet.com

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

আওয়ামী লীগ নিজের মাথায় আঘাত করেছে



২০১২-০৩-১৬

কাজটা দুঃসাধ্য। তবু অভূতপূর্ব দক্ষতার সাথে আওয়ামী লীগ সে অসাধ্য সাধন করেছে- তারা নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করেছে। গত ১২ মার্চ বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট এবং গণতন্ত্রমনা আরো কায়েকটি দলের মহাসমাবেশ সম্বন্ধে অন্য কোনো রায় দেয়া সম্ভব নয়।
বিএনপি যদি সোমবার হরতাল ডাকত, সেটা এতটা সফল হতো কি না বলা কঠিন। কিন' শাসক দল আওয়ামী লীগ গায়ে পড়ে বিএনপিকে অভূতপূর্ব সাফল্য দিয়েছে। বিএনপি এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারিত মহা-মহাজোটের সমর্থকেরা মনে মনে নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ দেবেন।
অথচ এ দিনের কর্মসূচি বানচাল করে দেয়ার ওপর আওয়ামী লীগ তাদের ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছিল। তিন দিন আগে থেকে তারা ঢাকাকে অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত করেছিল। আশা করেছিল যে, সে দুর্গে চোখ বন্ধ করে বসে থেকে তারা এই বলে আত্মপ্রতারণা করবে যে, বিএনপি মহাসমাবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আওয়ামী লীগের গদি এখন নিরাপদ। আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমতের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল শনি থেকে সোমবারের মধ্যে সেটা যে সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে চলে গেছে, শাসক দলের কোনো কোনো নেতা হয়তো এখনো সেটা বুঝে উঠতে পারেননি। বড় বড় কথা আর হুমকি-ধমকি দিয়ে তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করছেন, যেমন করে অন্ধকারের নিঃসঙ্গ পথিক ভয় কাটাতে শিস দেয়। বাংলাদেশের মানুষকে চিনতে অস্বীকার করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। 
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের শুরু থেকে আওয়ামী লীগ বরাবরই স্বৈরতন্ত্রী দল ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে এসে সেটা সন্ত্রাসী দলে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা পেয়ে তিনি যে সশস্ত্র ক্যাডার গঠন করেন, তাদের ব্যবহার করা হয়েছিল বিএনপিকে বাকরোধ করার কাজে। বিএনপিকে তারা সভাসমাবেশের জন্য স'ান দেয়নি, রাজপথে বিএনপির মিছিলের ওপর অসংখ্যবার হামলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মালিবাগে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ডা: ইকবালের নেতৃত্বে ক্যাডারেরা বিএনপির মিছিলে গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিল। আরো উল্লেখ্য, দ্বিতীয় দফা গদি পেয়ে শেখ হাসিনার সরকার ডা: ইকবাল ও অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় গদি পেয়ে আওয়ামী লীগ সশস্ত্র ক্যাডারদের সংখ্যা বহু গুণে বাড়িয়ে তুলেছে। এদের পোষা হচ্ছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ইত্যাদি আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলোর ছত্রছায়ায়। এবারে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে শুধু বিএনপিকে সভা-সমিতি আর মিছিল করা থেকে বঞ্চিত করাই নয়, বিএনপিসহ সব গণতান্ত্রিক প্রতিপক্ষকে সমূলে উচ্ছেদ করার কাজে। বিএনপিকে সভাসমাবেশ করার অনুমতি কিংবা স'ান দেয়া হয় না। দেয়া হলেও আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা একই সময়ে এবং একই স'ানে ভুয়া সভা, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি ডেকে বসে। দলীয়কৃত প্রশাসন ‘ওপর-ওয়ালাদের’ নির্দেশমতো ‘শান্তি রক্ষার্থে’ ১৪৪ ধারা জারি করে বিএনপির সভা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিগত তিন বছরে এমন ঘটনা বাংলাদেশের সর্বত্র অহরহ ঘটছে।
নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস'া ফিরিয়ে আনতে খালেদা জিয়ার আন্দোলনের সাফল্যে সরকার ভীত ও শঙ্কিত। রোডমার্চ করে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের মানসকন্যা খালেদা জিয়া সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামে গেছেন। লাখ লাখ লোক সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে তাকে হর্ষধ্বনি দিয়েছেন, পথসভাগুলোতে তার বক্তৃতা শুনেছেন বহু লক্ষ লোক, নির্ধারিত সভাগুলোতে কয়েক কোটি লোক এ যাবৎ তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে তার ভাষণে উৎসাহিত হয়েছেন। এসব সভায় নেত্রী একটাই দাবি করেছেন, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস'া ফিরিয়ে আনতে হবে। কোথাও যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গ মুখেও আনেননি। অথচ আওয়ামী লীগের গোয়েবলস আর তাদের প্রচারযন্ত্রগুলো দিন-রাত প্রচার চালাচ্ছে যে, খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের ‘বিচার’ বন্ধ করতে আন্দোলন চালাচ্ছেন।

গণভীতিতে বুদ্ধি বিভ্রম
বাংলাদেশের মানুষ বুঝে গেছে, তারা দেখছে এক দৃশ্য, কিন' আওয়ামী লীগ তাদের বোঝাতে চাইছে অন্য কিছু। এত দিন যারা দ্বিধাসঙ্কটে ভুগছিল, স্বাধীনতা আন্দোলনের দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি যাদের কিছু সহানুভূতি অবশিষ্ট ছিল, তাদেরও এখন মোহভঙ্গ হয়েছে। তারা বুঝে গেছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ তাদের সাপের পাঁচ পা দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতারা জানতেন- অবাধে খালেদার ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ আন্দোলন চলতে দিলে কোটি মানুষ দেশের দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসত নেত্রীর মুখ থেকে কিছু আশার কথা শুনতে। জনতাকে এরা আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বমুখী চরম ব্যর্থতার কথা, এ সরকারের ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনার কথা, বাংলাদেশকে আরেকটি সিকিম করার বিনিময়ে হাসিনার গদি চিরস'ায়ী করার কথা শুনতে দিতে চায়নি। জনতার প্রতি ভয় এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের বুকে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১২ মার্চের ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ আন্দোলন ব্যর্থ করে দেয়ার উন্মাদ সিদ্ধান্ত সে জন্যই তারা নিয়েছিল।
বাংলাদেশের মানুষের নাগরিক অধিকার, তাদের মানবিক অধিকারকে যে আওয়ামী লীগ কানাকড়ি মূল্য দেয় না, ১২ মার্চ সেটা প্রমাণিত হয়েছে। কিন' সে জন্য তাদের কী মূল্য দিতে হবে, তারা ভেবে দেখেনি। নইলে এই চোরাবালিতে তারা পা দিতো না।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। কোনো না কোনোভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের নাড়ি রাজধানীর সাথে গ্রথিত। কাজকর্মে লোকে রাজধানীতে থাকে। তারা এবং তাদের পরিবার-পরিজন আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে গ্রামের বাড়িতে যায়। কিন' আবার ঢাকায় ফিরে আসতে হয়। গ্রামীণ স্বাস'্যব্যবস'া নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনীতি করছে। হাজারে হাজারে দলীয় কর্মী ও ক্যাডারকে তারা স্বাস'্য বিভাগে চাকরি দিয়েছে, কী স্বাস'্যব্যবস'া তারা দেবে? অতএব, অসুখ হলেই ঢাকায় নিতে হয় রোগীকে। সব ধরনের ব্যবসায়-বাণিজ্যের, এমনকি আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতাদের ঘুষ দিতেও যেতে হয় ঢাকায়। প্রবাসী কর্মীদের কর্মস'লে ফিরে যাওয়ার বিমানও ছাড়ে ঢাকা থেকে।
শনি থেকে সোমবার- এই তিন দিন কোনো বাস, লঞ্চ এমনকি প্রাইভেট গাড়িও ঢাকায় আসতে দেয়া হয়নি। প্রবাসী কর্মীদের কতজন যথাসময়ে কাজে যেতে পারেননি বলে চাকরি খুইয়েছেন? চিকিৎসায় বিলম্ব হয়েছিল বলে কতজন হতভাগা প্রাণ হারিয়েছেন? তিন দিন অচল থাকা বাস, ট্রাক, লঞ্চগুলোর মালিকদের কত টাকা লোকসান হয়েছে? কত লোকসান দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা? কত মানুষ প্রতিদিন জেলাগুলো থেকে ঢাকায় আসেন?- তিন লাখ? পাঁচ লাখ? এক কোটি? নিজ দেশে অবাধে বিচরণ তাদের মানবিক অধিকার। সে অধিকারে হস্তক্ষেপ করে সরকার গুরুতর অপরাধ করেছে। ওপরে বর্ণিত তালিকার মানুষগুলোর আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের ওপর ক্রুদ্ধ না হওয়ার কোনো কারণ আছে?

সরকার বিএনপির হরতাল সফল করে দিয়েছে
অবরুদ্ধ রাজধানীর অবরুদ্ধ মানুষের ভোগান্তিও কম হয়নি। গণপরিবহন চলেনি ঢাকায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তারা কাজকর্মে যেতে পারেননি। পায়ে হেঁটে যারা গিয়েছিলেন কষ্ট করে পায়ে হেঁটেই তাদের ফিরতে হয়েছে। দোকানপাট বন্ধ ছিল। পরিবহন ব্যবসায়-বাণিজ্যের পূর্বশর্ত। সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশে পরিবহন বন্ধ ছিল বলে কত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে ব্যবসায়ীদের? রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ ছিল। এ সরকার শিক্ষাকে কেমন গুরুত্ব দেয় এই হচ্ছে তার নমুনা। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বন্ধ রেখে, রাজধানীকে দুই টুকরো করে আওয়ামী লীগ সরকার নাগরিকদের সবাইকে ক্রুদ্ধ, অপমানিত করেছে। তার ওপর সোমবার যে অভিজ্ঞতা সাধারণ নাগরিকদের হয়েছে তার তিক্ত স্বাদ দীর্ঘকাল তাদের মুখে লেগে থাকবে, আওয়ামী লীগের কথা মনে করে তারা থুথু ফেলবেন।
ঢাকাকে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করার উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ১৯ দফা নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সরকারের জ্ঞাত বিরোধীদের গ্রেফতার, যানবাহন তল্লাশি আর বিরোধী দলের সমর্থকদের যানবাহন হুকুমদখল (রিকুইজিশন) করার নির্দেশ সেই ১৯ দফার মধ্যে পড়ে। রাজধানীতেও সে দিন জনসমাবেশ বন্ধ করার জন্য পুলিশকে বহু নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সমাবেশের আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ সমাবেশের অনুমতি দিতে বিলম্ব করেছে, রোববারের রাত বেশ খানিকটা বেড়ে যাওয়ার আগে মঞ্চ তৈরি করতে দেয়া হয়নি, কতগুলো মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে তার সংখ্যা বেঁধে দেয়া হয়েছিল, এমনকি সমাবেশের লোক কোথায় দাঁড়াতে পারবে তারও একটা সীমারেখা বেঁধে দেয়া হয়েছিল। 
‘অমৃত সায়রে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল’। আওয়ামী লীগের হয়েছে সে অবস'া। যতগুলো উদ্দেশ্যে তারা বিএনপির সমাবেশ বানচাল করতে চেয়েছিল তার প্রত্যেকটিরই হয়েছে উল্টো ফল। প্রকৃত প্রস্তাবে মাইক্রোফোনের অসুবিধা সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার সমাবেশ আশাতিরিক্ত সফল হয়েছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকেরা আমাকে বলেছেন, প্রায় তিন লাখ লোক সমাবেশে এসেছিলেন, সভা শুরু হওয়ার অনেক আগেই পুলিশের নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়েছিল সমাবেশ।
খালেদা জিয়ার চারটি রোডমার্চ, বহু পথসভা ও জনসভা এবং আরো পরে বিভিন্ন জেলায় তার জনসমাবেশে কোথাও অশান্তি হয়নি। সোমবারও বিএনপি ও বিরোধী ১৬ দলের জোটের জোট থেকে কোথাও অশান্তি ঘটেনি। কিছু অশান্তি ঘটিয়েছিল ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা। তারা সমাবেশমুখী ছোটখাটো দলের ওপর হামলা করেছে। শেখ হাসিনার এই বরপুত্রদেরই আবার সরকার পুলিশের ভূমিকায় ব্যবহার করেছে। তারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে লোকজনকে যানবাহন থেকে নামিয়ে এনেছে, তাদের দেহতল্লাশি করেছে।

বাক ও সংবাদের স্বাধীনতা হত্যা
লাখ পাউন্ড ব্যয়ে বিদেশে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে হাসিনা সরকার দাবি করেছে, বাংলাদেশে বাক ও সংবাদের স্বাধীনতা আদর্শস'ানীয়। কিন' এতকাল বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে অন্য ছবি। বিরোধী দলকে তারা সভা-সমিতি করতে দিতে নারাজ। সাংবাদিকদের ওপর বহু নির্যাতন হয়েছে। প্রায় এক ডজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন বর্তমান সরকারের আমলে। খুনিরা অবশ্যই শাসক দলের কাছের মানুষ। নইলে এরা অবশ্যই ধরা পড়ত। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং রুনি-সাগর দম্পতির হত্যা তদন্তের ভার নিয়েছেন, সে কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অন্য হাজারো ব্যর্থতার মতো এখানেও প্রধানমন্ত্রী চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। খুনিরা ধরা পড়েনি। শোনা যাচ্ছে, দুই খুনিকে নিরাপদে আমেরিকায় চলে যেতে দেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার সমাবেশের সরাসরি লাইভ সম্প্রচারের মধ্যেই একুশে টেলিভিশন, বাংলাভিশন ও ইসলামী টেলিভিশন চ্যানেল তিনটির সংযোগ কেটে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের স্বল্পবুদ্ধি নেতারা হয়তো নিজেদের ‘সাফল্যে’ বগল বাজাচ্ছেন। কিন' তারা ভুলে গেছেন যে, এই তিনটি চ্যানেলের লাখ লাখ দর্শক শা...বা... বলে সরকারকে গালি দিচ্ছেন, মনে মনে আওয়ামী লীগ নেতাদের মুণ্ডু চিবোচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষক দেশ ভারত ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি প্রীত হওয়ার মতো নয়। সোমবারের সমাবেশ সম্বন্ধে বিদেশী মিডিয়ার বিবরণ সে ভাবমূর্তিতে আরো কয়েক পোঁচ কালি লেপে দিয়েছে। লজ্জা-শরম বলে যদি কোনো কিছু এ সরকারের থেকে থাকে, তাহলে তাদের উচিত লম্বকর্ণ বিশিষ্ট একটি চতুষ্পদ জীবের মতো চিৎকার না করে সুস' মস্তিষ্কে বিএনপির ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে নিজেদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা। খালেদা জিয়া ২৯ মার্চ হরতাল ডেকেছেন, তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার ঘোষণা না দিলে ১১ জুন আবার ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ অবিলম্বে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি মেনে নিলে নিজেদেরও অনেক কল্যাণ করবে।
(লন্ডন, ১৩.০৩.১২)
serajurrahman@btinternet.com

সংসদের ভাষা : অশালীনতার মাপকাঠিতে কে কোথায়



২০১২-০৩-২৩

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদে ফিরে গেছে, এটা ভালো কথা। সংসদে বসে তারা জাতির ও দেশের ভালোমন্দ বিবেচনা করবেন, সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন আর জাতিকে মহত্ত্বর, উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন- এসব উদ্দেশ্যেই ভোটদাতারা তাদের নির্বাচিত করেছিলেন। অন্তত নীতির দিক থেকে সেটা সত্যি কথা। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে নীতি আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান বঙ্গোপসাগরের মতোই দুস্তর। বাস্তবতা প্রায়ই নীতিকে খুঁজে পায় না।
সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট তাদের নিখুঁত আর সুগভীর তদন্তের জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। ইকোনমিস্ট বলে দিয়েছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ‘ভারতের বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শের জোরে’। সে নির্বাচন যে ন্যায্য আর নিরপেক্ষ হবে না সেটা আগে থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা নিজ মুখে স্বীকার করেছিলেন যে, ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদের বর্ণচোরা সামরিক স্বৈরতন্ত্র ছিল তাদের ‘আন্দোলনের ফসল’। বিচিত্র নয় যে, সে সরকার শেখ হাসিনাকে গদিতে বসানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল। তার ওপরেও বিএনপিকে ধ্বংস করার নানা চেষ্টা করেছে সে সরকার আর তাদের তৈরী নির্বাচন কমিশন। কমিশন বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করতে চেয়েছিল। নির্বাচনে বিএনপিকে হারানোর বহু কসরত হয়েছে, দু’টি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীও সে ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিল।
ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিএনপি গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মাস্টারপ্ল্যানের পরাজয় মেনে নিয়েছিল এবং সংসদে যোগও দিয়েছিল। কিন' সেটাও বিদেশী সাহায্যে স'াপিত সরকারের সহ্য হয়নি। পরাজিত বিএনপির নাক মাটিতে ঘষে দেয়ার সব রকমের চেষ্টা করেছে ‘বিজয়ী’ দল। সংসদকক্ষে আসন বরাদ্দ, বিরোধী দলের কথা বলার অধিকার ইত্যাদি নিয়ে বহু নোংরামি হয়েছে। এমনকি সেসব ব্যাপারে স্পিকারও সব সময় নায্যতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি।
সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং ‘উজ্জ্বল নক্ষত্র’ তার কয়েকজন সহকারীর ভূমিকা। দিনের পর দিন তারা কদর্য ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে সংসদের পবিত্রতা নষ্ট করেছেন, সংসদকক্ষের প্রতিটি আনাচ-কানাচকে পূঁতিগন্ধপূর্ণ করে তুলেছেন। শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে ছিলেন। তারা খুব সম্ভবত নিজেদের স্বার্থের অনুকূল করে তাকে সহায়ক করে তুলেছেন। তিনি দেশে ফিরে এসেছেন এই বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে যে, তার পিতা হত্যার পরের অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিসি'তিতে যারা রাষ্ট্রতরণীর হাল দৃঢ় হাতে ধারণ করে শিশুরাষ্ট্রকে অতলে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন, তারা সবাই তার পিতা ও পরিবারের হত্যাকারী এবং তাদের ক্ষমতা গ্রহণ চৌর্যবৃত্তিরই শামিল। লক্ষণীয় এই, শেখ হাসিনার এই চিন্তাধারা এসেছে তার এ বিশ্বাস থেকে যে, তার পিতা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সুতরাং বাংলাদেশ তার বংশানুক্রমে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তি।
শেখ মুজিব জীবিতাবস'ায় কখনো দাবি করেননি যে, তিনি স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। সত্যি বটে, স্বাধীনতা কথাটা তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে উচ্চারণ করেছিলেন। সে উচ্চারণ তার আগে মওলানা ভাসানী এবং অন্যরাও করেছেন। কিন' আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইত্যাদির জন্য যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন সে ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। শহীদ জিয়াকে সে কৃতিত্বটুকু দিতেও বর্তমান সরকার রাজি নয়, এমনই তাদের আক্রোশ।
জিয়াউর রহমান সংশয়পূর্ণ দেশ আর সেনাবাহিনীর আত্মঘাতী বিভ্রান্তির মধ্যে ক্ষমতায় এসে শক্ত হাতে রাশ টেনে ধরেছিলেন। তিনি বাকশালী স্বৈরতন্ত্রকে উল্টে দিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন, বাক ও সংবাদের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছিলেন, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দেশ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তার অবদান এত বেশি ছিল বলেই বোধ হয় তার বিরুদ্ধে হাসিনার ঈর্ষা ও ক্রোধ অন্তহীন। স্মরণীয় যে, ভারত থেকে হাসিনার দেশে ফেরার ১৩ দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন। সে ষড়যন্ত্রে কে বা কারা জড়িত থাকতে পারে সে সম্বন্ধে তখন অনেক জল্পনা-কল্পনা হয়েছিল। জিয়ার হত্যার পরও আওয়ামী লীগ নেত্রীর আক্রোশ প্রশমিত হয়নি। জিয়ার পত্নী ও পুত্রদের হয়রানি করার কোনো চেষ্টা তিনি বাদ দিচ্ছেন না।
খালেদার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর গালিগালাজ
নতুন সংসদে নতুন প্রধানমন্ত্রী গোড়া থেকেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তার নির্বাসিত পুত্রদের বিরুদ্ধে কদর্য গালিগালাজ শুরু করেন। আরো কয়েকজন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য তাতে ধুয়া ধরেন। সংসদের পরিবেশ এমন পূঁতিগন্ধপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় যে, বিরোধী দল একাধিকবার সংসদ বর্জন করতে বাধ্য হয়। অবশ্যি সরকারি দলের তাতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তারা প্রায় বিনা আলোচনায় যদৃচ্ছ ‘আইন‘ পাস করেছে, সংবিধানকে তুলোধুনো করে ছেড়ে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছিলেন যে, ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে‘ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস'া অন্তত আরো দু’টি সাধারণ নির্বাচনে চালু রাখা উচিত। কিন' বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা সংবিধান আর গণতান্ত্রিক রীতিপদ্ধতির ওপর স্টিমরোলার চালিয়ে ফ্যাসিবাদী পদ্ধতিতে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চায়। তারা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি উপড়ে ফেলেছে, এই হাস্যকর যুক্তিতে যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সে পদ্ধতি আর বজায় রাখা সম্ভব নয়।
বিরোধী দল সংসদ বর্জন করে চলছিল বলে সংসদে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ তাদের ছিল না। সে জন্যই গত রোববার (১৮ মার্চ) তাদের সংসদে প্রত্যাবর্তন সমুচিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও গণতন্ত্রকামী অন্য দলগুলো সংসদের বাইরে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার পক্ষে দুর্জয় জনমত গড়ে তুলেছে। এখন সংসদে ফিরে গিয়ে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে সে দাবি উচ্চারণ করার উপযুক্ত সময়।
বিএনপির প্রত্যাবর্তনের প্রথম দুই দিন এ দলের দু’জন মহিলা সংসদ সদস্যের কিছু অশালীন উক্তি নিয়ে সংসদে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে। স্পিকার-সংশ্লিষ্ট অংশগুলো অসংসদীয় বলে কার্যবিবরণী থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ (মুছে ফেলা) করেছেন। সেটাই সঙ্গত ব্যবস'া। এর পূর্ববর্তী সময়ে সরকারি দলের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কদর্য উক্তিগুলো সম্বন্ধে যদি তিনি সমানে দৃঢ়তা দেখাতে পারতেন তাহলে পরিসি'তির হয়তো এত অবনতি হতো না।
সাধারণ মানুষের এটা মনে করা স্বাভাবিক হবে যে, আলোচ্য দু’জন মহিলা সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের মন্ত্রীসহ আরো কিছু সংসদ সদস্যের উক্তির সামনে ‘আয়না’ তুলে ধরে সঠিক কাজই করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বহু উক্তিতে বিরোধী দলের নেত্রী অবশ্যই অপমান বোধ করেছেন, কিন' সাধারণ মানুষের অনুভূতিও খুবই আহত হয়েছে। সাধারণ বুদ্ধিতে বলে পাল্টা অভিযোগ তাদের মুখের ওপর ছুড়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীরা ভবিষ্যতে এ ধরনের কটু কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন। ‘ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়’- এ শিক্ষা তাদের হবে।
প্রধানমন্ত্রী অতি সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, খালেদা জিয়া ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোলে বসে’ ক্ষমতা পেতে চান। ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদ স্বৈরশাসনের সাথে আওয়ামী লীগ নেত্রীর হার্দিক সম্পর্কের আলোকে তিনি সে সরকারের কোলে বসে ক্ষমতা পেয়েছিলেন বলে যে মন্তব্য করা হয়েছে তা থেকে যদি প্রধানমন্ত্রীর মনে এ উপলব্ধি আসে যে, এ জাতীয় মন্তব্য অপমানকর ও পীড়াদায়ক, তাহলে সেটা কল্যাণকর হবে। 
খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ২০০১ সালের নির্বাচনে যে সাংগঠনিক প্রতিভা দেখিয়েছিলেন তা থেকে আওয়ামী লীগের ভীত হওয়া স্বাভাবিক। তার ওপর শহীদ জিয়াউর রহমানের পরিবারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত গাত্রদাহের ব্যাপার তো আছেই। শেখ হাসিনা একজন অর্ধশিক্ষিত ও অমার্জিত উকিলকে দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে (তার নিজের বিরুদ্ধে ১৫টি গুরুতর দুর্নীতির মামলাসহ) সাত হাজারেরও বেশি ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নিয়েছেন, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন খুনির দণ্ড মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন। অপর দিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে জিয়া পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা সাজানো হচ্ছে, সুপ্রাচীন বহু মামলায় তারেক রহমানকে ‘পরিপূরক তালিকায়’ আসামি করা হচ্ছে। 

দুর্নীতি ও দুর্নীতির সম্ভাবনা
তারেকের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনায় আওয়ামী লীগ যে আতঙ্কিত এ কথা সবাই জানে। সুতরাং অনেকেই মনে করেন যে, শেখ হাসিনার পুত্র সম্বন্ধে কিছু বয়ান সংসদে উত্থাপনের প্রয়োজন ছিল। সজীব ওয়াজেদ জয় একটি মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচ মিলিয়ন ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছাপার জের ধরে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আদালত ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন, কিন' তার পরও বাড়তি তিন মাস তাকে কয়েদ করে রাখা হয়েছিল। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে যদি মামলা হতে পারে তাহলে সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন তদন্তও হবে না?
মাত্র কিছু দিন আগে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড. লিয়াম ফক্সকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তার অপরাধ : তার এক বন্ধু তার উপদেষ্টা বলে দাবি করে ভিজিটিং কার্ড বিলি করেছেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরকারি সফরের সময় সেখানে হাজির ছিলেন। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ হয়নি, কিন' সে সুযোগে উপরিউক্ত ব্যক্তি হয়তো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে আর্থিক লাভবান হতে পারতেন এমন একটা ইঙ্গিত অবশ্যই ছিল। সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে যে, তিনি বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দাবি করে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়েছেন এবং ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী মহলে সে কার্ড বিলি করেছেন। তা ছাড়া টেলি-সংবাদে অনেকেই নিশ্চয় দেখেছেন যে, জয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বিদেশসফরে তার সঙ্গী হয়েছিলেন।
আমার পরম সৌভাগ্য, বহু দেশ থেকে সহৃদয় পাঠকেরা আমাকে টেলিফোন করেন, ইমেইলে মন্তব্য খবর ও গুজব ইত্যাদি পাঠান। বিভিন্ন সময়ে তাদের কেউ কেউ আমাকে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে জয়ের অন্তত দু’টি প্রাসাদোপম অট্টালিকা আছে এবং তার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের জ্ঞাত কোনো উৎস তার নেই। তা ছাড়া অসংলগ্নতার জন্য তার নাম পুলিশের নথিভুক্ত বলেও কেউ কেউ আমাকে জানিয়েছেন। অনুরূপভাবে কেউ কেউ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা-জামাতা কানাডায় অভিজাত জীবনযাপন করছেন, কিন' তারা কোনো চাকরি কিংবা ব্যবসায় করছেন বলে কেউ জানে না। এমন অভিযোগও আছে, যে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিরত থাকছে তার সাথে কানাডা প্রবাসী প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়দের কারো আচরণ জড়িত থাকতে পারে। বহু লোকের যখন এ ধরনের ধারণা আছে তখন বিষয়গুলো নিয়ে উপযুক্ত তদন্ত করে প্রধানমন্ত্রী পুত্র-কন্যাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন।
সংসদে বিএনপিদলীয় উপরিউক্ত মহিলা সংসদ সদস্যদ্বয়ের সংশ্লিষ্ট উক্তিগুলো অবশ্যই অশোভন ও অসংসদীয় ছিল। কিন' সংসদ জাতি ও দেশবাসীর জন্য। তারা যদি মনে করেন যে, এই দু’জন সংসদ সদস্যের উক্তি প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীদের দৃষ্টি উন্মোচনে সহায়ক হবে তাহলে সে উক্তিগুলোরও প্রয়োজন ছিল বলতে হবে। 
লেখক : বিবিসি খ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক 
লন্ডন, ২০.০৩.১২ 
serajurrahman@btinternet.com

সোমবার, ১৯ মার্চ, ২০১২

আন্তঃনদী-সংযোগ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা


২০১২-০৩-০৯

সভ্যতার আদি ধ্যানধারণা অনুপ্রাণিত হয়েছিল শান্তিপূর্ণ পারস্পরিক সহাবস'ানের স্বপ্ন থেকে। তুমি বেঁচে থাকো, আমাকেও বাঁচতে দাও- এটা সভ্য সমাজের খুঁটি। এর ব্যতিক্রম করা হলে অশান্তি ঘটে। আমাকে আক্রমণ করা হলে আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা আঘাত হানার অধিকার আমার থাকবে- এ বিশ্বাস সব সভ্য সমাজের আইনেও স্বীকৃত। দুর্ভাগ্যবশত মানবজাতি সব সময় সুসভ্য আচরণ করেনি, পরের অধিকারকে সম্মান করতে শেখেনি। তার পরিণতি কখনো মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হয়নি। জ্ঞাত ইতিহাসের অজস্র হানাহানি আর যুদ্ধবিগ্রহ তারই পরিণতি।
অথচ মানবজাতি সাধারণভাবে শান্তিতে বেঁচে থাকতে চেয়েছে। মানবজাতিকে শান্তির পথে চলতে সাহায্য করার আশায় প্রথম মহাযুদ্ধের পর লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সংস'া যথেষ্ট শক্তি সংগ্রহ করতে পারেনি। জাতিগুলো সংস'ার বিধিমালা মেনেও চলেনি। জার্মানি ও ইতালির ফ্যাসিস্ট শক্তি প্রথমে ইউরোপ ও পরে গোটা বিশ্বের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে চেয়েছিল। একপর্যায়ে জাপানও এই উন্মাদ উচ্চাভিলাষে শরিক হয়। কয়েক কোটি লোক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা গিয়েছিল, মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা কয়েক যুগ পিছিয়ে গেছে সে যুদ্ধে। জাতিসঙ্ঘের পত্তন হয়েছে সব দেশ ও জাতির গ্রহণযোগ্য বিধিমালা প্রণয়ন করে যুদ্ধবিগ্রহের প্রয়োজনীয়তার অবসান করা এবং বিশ্বশান্তি নিরাপদ করার লক্ষ্যে।
‘পরস্য অপহরণ’- অন্যের যা আছে আমি নেব, অন্যের ভাগটা আমি ভোগ করব, এই প্রলুব্ধতা সর্বকালেই সভ্যতার প্রতি প্রধান হুমকি হয়ে রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ সনদের মোটামুটি সাধারণ স্বীকৃতি-সমর্থনের কারণে পরের দেশ দখলের প্রবণতা হ্রাস পেলেও পরের সম্পদ অপহরণের স্পৃহা বরং বেড়েই চলেছে।
এ প্রবণতা সবচেয়ে লক্ষ্যমান নদীর পানির ব্যাপারে। নদীগুলো অনাদিকাল থেকে পাহাড়-পর্বত ও উচ্চভূমি থেকে বহু দেশ পেরিয়ে সমুদ্রে পড়ে। জনবসতি বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে চাষবাসে সেচ এবং পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীর পানির ব্যবহার অভাবনীয় রকম বেড়ে গেছে। উজানের দেশগুলোর অত্যধিক চাহিদার কারণে ভাটির দেশ প্রায়ই তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পানিও পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বিগত তিন দশক থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন যে, ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধগুলোর কারণ হবে নদীর পানির হিস্যা নিয়ে বিরোধ।
জাতিসঙ্ঘ এ দিকেও মনোযোগ দিয়েছে। একাধিক দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদনদী সম্বন্ধে জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের (চুক্তি) পঞ্চম ধারাটি ১৯৯৭ সালের ২১ মে ১০৪-৩ ভোটে গৃহীত হয়েছে। এতে নদীর পানিসম্পদের সুষম ব্যবহার তীরবর্তী দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কনভেনশনের ৭ নম্বর ধারায় নদীতীরবর্তী অন্য দেশগুলোর ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস'া নেয়া’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নদীর পানি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান স্বার্থের সঙ্ঘাতকে জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের পঞ্চম ও সপ্তম ধারার আলোকে বিবেচনা করতে হবে। ভারত দ্রুত উন্নয়নমুখী দেশ। কৃষির জন্য সেচ, কলকারখানার প্রয়োজন আর পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত অভিন্ন নদীগুলোতে অবিরাম বাঁধ নির্মাণ করে চলেছে। অভিন্ন নদীগুলোতে ভারত এযাবৎ ৫০টিরও বেশি বাঁধ তৈরি করেছে। মাত্র গত সপ্তাহে বৃহত্তর সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবহমান সারি নদীর উজানে নতুন তৈরী পানি-বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের (সরকারের নয়) প্রবল প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির ওপর ভারতের এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া হবে অভাবনীয়। বাংলাদেশ সীমান্তের উজানে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব বিবেচনা করলেই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া পরিষ্কার হয়ে যাবে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ষাটের দশক থেকে সাবেক পাকিস্তানের সরকার প্রবল প্রতিবাদ করে আসছিল। সে কারণে বাঁধটি তৈরি হলেও চালু হতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ১৪ দিনের জন্য ‘পরীক্ষামূলকভাবে’ ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রস্তাবে সম্মত হন। কিন' সে ১৪ দিন এখন চিরস'ায়ী হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করেন। চুক্তিতে সি'র হয়েছিল যে, খরার মওসুমে বাংলাদেশকে ৩০ হাজার কিউসেক (বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম) পানি দেয়া হবে। কিন' সে পরিমাণ পানিও বাংলাদেশ কোনো বছরই পায়নি।

শুকনো পদ্মা আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা
পরিণতিতে গঙ্গার বাংলাদেশ অংশ পদ্মার বেশির ভাগ শুকনো মওসুমে স্রোত থাকে না। পলি জমে জমে নদীর তলা উঁচু হয়ে শুকিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি/ দুই ধার উঁচু তার/ ঢালু তার পাড়ি।’ পদ্মা ছোট নদী নয়। প্রমত্তা পদ্মাকে নিয়ে বহু কবিতা, গান ও কাহিনী লেখা হয়েছে। কিন' এখন পদ্মায় সব সময় ‘হাঁটুজলও’ থাকে না। মানুষ, গরু আর গাড়ি অনায়াসে এ নদী পার হয়। পানির অভাবে পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে তৈরী গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প অকেজো হয়ে গেছে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল শুকনো মওসুমে মরুভূমির মতোই উষর। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের নদী মোহনাগুলো পলি জমে জমে উঁচু হয়ে গেছে। জোয়ারে আর সামুদ্রিক বানে বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি নদীর উজানে এলে আর নামতে পারে না। লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার একর উর্বর জমি অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে।
বর্ষায় ভারতীয়রা তাদের বাঁধ রক্ষার জন্য স্লুইস গেটগুলো খুলে দেয়। বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টি আর স্‌্েরাতের সাথে এই বাড়তি পানি যুক্ত হয়ে ধেয়ে আসে পদ্মা, মেঘনা প্রভৃতি বাংলাদেশের নদীগুলোতে। শুকিয়ে যাওয়া নদীতল সে পানি ধরে রাখতে পারে না। নদীর পার ভাঙে, হাজার হাজার একর উর্বর জমি হারিয়ে যায়। নদীর দুই তীর বন্যায় ডুবে যায়। নদীতল ক্রমেই উঁচু হচ্ছে বলে প্রতি বর্ষায় বন্যা বেশি থেকে আরো বেশি এলাকা ডুবিয়ে দিচ্ছে, সে পানি নেমে যেতেও বেশি থেকে বেশি সময় লাগছে। বন্যায় বার্ষিক ফসল হানি অপরিমেয়। অর্থাৎ ভারতের তৈরী বাঁধগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য শাকের করাত, যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। খরা ও বর্ষা- উভয় মওসুমেই বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
এই হচ্ছে একটি নদী-পদ্ধতির মর্মান্তিক দুর্দশা। তিস্তা-পদ্ধতির অবস'াও এখন সমানেই মর্মান্তিক। টিপাইমুখ বাঁধ চালু হলে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা অঞ্চলও একই রকম ঊষর হয়ে যাবে। শুধু যে ইলিশ মাছ আর আসবে না বাংলাদেশে তাই নয়, বাংলাদেশের পূর্বাংশের পরিবেশ প্রাণী উদ্ভিদ সব কিছু বদলে যাবে।
অর্থাৎ নদীর পানিসম্পদের ‘সুষম ব্যবহার’ করার জন্য জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের পঞ্চম ধারার এবং ‘অন্য দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস'া নেয়ার’ যে বিধান সে কনভেনশনের সপ্তম ধারায় আছে ভারত ইতোমধ্যেই তা অমান্য করে চলেছে। তার ওপর ১৯৮২ সালে ভারত একটা ‘মেগা প্রকল্প’ তৈরি করেছে উত্তর-পূর্ব ভারতের নদীগুলোকে একটি খাল দিয়ে সংযুক্ত করে সেসব নদীর পানি মধ্য ভারতের ঊষর অঞ্চলে সেচের জন্য নিয়ে যেতে। ভারতের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর মানুষ এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। এত বছর পর সুপ্রিম কোর্ট গত সপ্তাহে সে মামলার চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন। রায়ে মেগা প্রকল্পকে বৈধ ঘোষণা করে পরিবেশ-সংক্রান্ত সব ভারতীয় আপত্তি বাতিল করে দেয়া হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভারতের আইন ও ভারতের স্বার্থ বিবেচনা করে রায় দিয়েছেন। কিন' সে রায়ে যে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের পঞ্চম ও সপ্তম ধারার বিরোধিতা করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সেটা অগ্রাহ্য করেছেন। মেগা প্রকল্পটি নির্মাণ শুরু হলে সেটা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল হবে।

ভারত যে কারণে সাহস পায়
কথা হচ্ছে বাংলাদেশ কি বেঁচে থাকতে চায়? এবং বেঁচে থাকতে হলে বাংলাদেশীদের কী করতে হবে? সাদা চোখেই আমরা দেখতে পাচ্ছি- স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই দেশের জীবন-মরণের এ প্রশ্নটি নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতার সময় থেকেই নাগরিকদের একাংশ সুশীলসমাজের ছত্রছায়ায় এবং ভারতীয় দালালদের সহায়তায় বাংলাদেশকে আবারো ভারতের সাথে সংযুক্ত করার প্রস'তি হিসেবে ‘বাঙালি জাতীয়তার’ ধ্বনি তুলেছে। ‘ওপারের বাঙালিরা’ আমাদের যতই পদাঘাত করুক ‘বাঙালি জাতীয়তার’ পূজারীরা সেসব অগ্রাহ্য করে দাদা-দিদিদের পদলেহন করে চলেছে। বাংলাদেশের স্বার্থ সম্যক উপলব্ধি করার সময় ও সুযোগ দেশের মানুষ পায়নি।
অপেক্ষাকৃত সামপ্রতিককালে বড় দল দুটোর একটা বাকশালী স্বৈরতন্ত্র ফিরিয়ে এনে গদি চিরস'ায়ী করার উন্মাদ স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। সে লক্ষ্যে তাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হয়েছে এক দিকে সব প্রকারের গণতান্ত্রিক বিরোধিতাকে নির্মূল করা, অন্য দিকে পাশের বড় দেশের অনুগ্রহ লাভের যথাসাধ্য চেষ্টা করা। রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে। দাড়ি ও টুপি পরিহিত কোনো লোক রাজনীতির কথা বললেই তাকে যুদ্ধাপরাধী বলে জেলে পোরা হয়, ঐক্য-সংহতি বলে যে একটা কথা অভিধানে আছে, আজকের বাংলাদেশে এলে সেটা মনে হয় না।
ভারতের অনুগ্রহ লাভের জন্য এমন কিছু নেই, যেটা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার করছে না। আমাদের পররাষ্ট্র-স্বরাষ্ট্র সব নীতি ভারতের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। বিদেশী উসকানি ও সহযোগিতায় বিডিআরে বিদ্রোহ ঘটিয়ে ৫৭ জন উচ্চপদস' সেনাকর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে, বিডিআরকে অবলুপ্ত করা হয়েছে, এমনকি সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিএসএফ এখন খেয়ালখুশিমতো বাংলাদেশীদের হত্যা করছে, বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে আমাদের নাগরিকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের কৃষকদের ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের রেল, সড়ক ও সমুদ্রবন্দরগুলো ভারতের করিডোর ও বহির্বাণিজ্যের জন্য বিনামূল্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর ভৌগোলিক এলাকা যেন এখন ভারতের খেলার সামগ্রী। তারা আমাদের নদী-উপনদী আর খালে বাঁধ নির্মাণ করে ১৩৪ চাকার ট্রাক ও ট্রেইলার চালায়। টিপাইমুখে ভারতের বাঁধ তৈরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সাহস বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নেই।
ভারতের সংযোগ খালটি তৈরি হলে নদীর পানির প্রাপ্যতা আর পরিবেশের ওপর কুপ্রভাবের ভয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগরিকরাই উদ্বিগ্ন। সে জন্যই তারা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছিল। বাংলাদেশের আশু কর্তব্য জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা, কেননা; আগেই বলেছি, এ রায় জাতিসঙ্ঘের নদীর পানিসংক্রান্ত কনভেনশনের পঞ্চম ও সপ্তম ধারার বিরোধী। কিন' শেখ হাসিনার সরকার সে আপিল করবে কি? মোটেই মনে হয় না। কেন না শেখ হাসিনা আশা করছেন, ভারতের ‘বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শেই’ তিনি গদি আঁকড়ে থাকতে পারবেন।
প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য
জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের সাহায্য চাওয়ার জন্য দুর্ভাগ্যবশত আমাদের পরবর্তী সরকার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুর্ভাগ্য এ জন্য বলছি যে, ভারতীয়রা সংযোগ খালটি তৈরি করে ‘ফেইট একম্পলি’ (প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা সৃষ্টি) করে ফেললে সেটার পরিবর্তন সব সময়ই কঠিন হয়। কিন' আমাদের বা নাগরিকদেরও অনেক কিছু করণীয় আছে। সরকার নীরব থাকলেও সব গণতান্ত্রিক শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের উচিত ভারতকে এবং বিশ্বসংস'া ও বিশ্বসমাজকে জানিয়ে দেয়া যে, ভারতের পানি আগ্রাসনের দরুন বাংলাদেশের যে পরিমাণ ভূমি চাষাবাদ ও মনুষ্য বসতির অযোগ্য হয়েছে, সে পরিমাণ ভূমি বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে দাবি করবে।
সরকার যখন নিষ্ক্রিয় তখন দেশকে বাঁচানোর, দেশের ভবিষ্যৎকে বাঁচানোর দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিককে হাতে তুলে নিতে হবে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের একখানি ট্রেন, একটি ট্রাক কিংবা একখানি জাহাজও যাতে যেতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা প্রত্যেকটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য হবে। আর এক বোতল ফেনসিডিলও যাতে বাংলাদেশে না আসে সে দিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। বাংলাদেশে আজকাল চমৎকার শাড়ি ও জামাকাপড় তৈরি হয়। তার পরও ভারতীয় শাড়ি পরার বিলাসিতা বর্তমান অবস'ায় গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতীয় শাড়ি-কাপড় বর্জন করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী নারীর কর্তব্য হবে। কোনো নারীকে ভারতীয় শাড়ি পরতে দেখা গেলে তাকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।
ইতোমধ্যে অবৈধভাবে যেসব ভারতীয় বাংলাদেশে বাস করছেন, চাকরি করছেন, পেছনে থেকে আওয়ামী লীগ গুণ্ডাদের উসকানি দিচ্ছেন, এমনকি ভোটও দিচ্ছে আওয়ামী লীগকে, ‘সিটিজেন্স অ্যারেস্ট’ বিধির আওতায় তাদের সবাইকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করতে হবে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ কথা এর পরেও যারা উচ্চারণ করবে, তাদের ধরে জিজ্ঞেস করতে হবে- শেখ হাসিনা ও দীপুমণির বন্ধু মমতা ব্যানার্জি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন কি না, করলে তিনি কেন শুধু সর্বনাশা বর্ষাকালেই বাংলাদেশকে নদীর পানি দেবেন, তিনি কেন বাংলাদেশের পাওনা জমি বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দেবেন না? তাতেও যদি কারো চৈতন্যের উদয় না হয়, তাহলে বুঝতে হবে, তিনি বাংলাদেশকে বিলুপ্ত করে আবারো অখণ্ড ভারত গড়তে চান। তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয়া সবার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে।
লন্ডন, ০৫.০৩.১২
serajurrahman@btinternet.com