বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১২

ভিআইপিদের সফর বাংলাদেশকে কোথায় রেখে গেছে

ভিআইপিদের সফর বাংলাদেশকে কোথায় রেখে গেছে


॥ সিরাজুর রহমান ॥

যে ব্যক্তি এবং যে জাতি নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখেনি তারা সব সময়ই আশা করে বসে থাকে ‘আত্মীয়বাড়ির লোকেরা’ তাদের জন্য মণ্ডা-মিঠাই আনবে, তাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। কোথাকার কোন বিদেশী তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা বাংলাদেশে আসবেন সে নিয়ে বাংলাদেশী মিডিয়ার মাতামাতিতেও আমাদের পরমুখাপেক্ষিতার প্রমাণ বহন করে।
হিলারি কিনটন কিংবা প্রণব মুখার্জি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। স্বল্প সফরে হলেও তারা এসেছিলেন এবং তারা চলেও গেছেন। মামাবাড়ির অতিথিরা চলে যাওয়ার পর শিশুরা ভাবতে বসে, মিষ্টি কি তারা যথেষ্ট খেয়েছে, আরো কিছু খেতে পারলে মজা বেশি হতো। হিলারি আর প্রণবের সফরের পরে মিডিয়ারও যেন হয়েছে সে অবস্থা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি। বহু দেশে বহু ব্যাপারে সে এখনো কলকাঠি ঘোরায়। বাংলাদেশে অত্যন্ত দৃশ্যমান ভাবে ঘুরিয়েছিল ২০০৬-২০০৮ সালে। ভারতের রাষ্ট্রদূত আর কিছু পরিমাণে হলেও ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে সাথে নিয়ে তারা একটা বর্ণচোরা সেনাশাসন চালু করেছিল। এখন আর বুঝতে বাকি নেই, একটা ‘মাইনাস ওয়ান’ ফর্মুলা অনুযায়ী বিএনপিকে ধ্বংস করা এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটা ভারত-মার্কিন আজ্ঞাবহ সরকার স্থাপন করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এই তিনটি দেশের পরিকল্পনা আর ইকোনমিস্ট সাপ্তাহিকীর ভাষায় ভারতের ‘বস্তা বস্তা টাকা ও পরামর্শে’ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল।
ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর হিসাবে কিছু ভুল হয়ে গিয়েছিল। অন্য বড় পৃষ্ঠপোষককে উপেক্ষা করে তিনি নিকটতম পৃষ্ঠপোষক ভারতের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। ড. ইউনূসকে তারই প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বরখাস্ত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য বহু দেশে ইউনূসের বহু গুণগ্রাহী ও বন্ধুকে আহত করেছেন। হিলারি কিনটন তখন দীর্ঘ টেলিফোন বার্তায় চাঁচাছোলা ভাষায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনে মার্কিন কলকাঠি নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেছনের দরজা দিয়ে সে কথোপকথনের আক্ষরিক বিবরণ বিশ্ব মিডিয়ায় ফাঁসও করে দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভুল করেছিলেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, আমেরিকা তার নতুন পাওয়া বন্ধু ভারতকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে। সুতরাং ওয়াশিংটনকে হেনস্তা করে আসলে তিনি দিল্লিকে বিশেষ সন্তুষ্ট করেননি। দিল্লি তাকে চিরকাল গদিতে আসীন রাখবে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তিনি দিল্লির সব চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মার্কিন সরকারের অসন্তুষ্টির প্রমাণ হিসেবে হিলারি কিনটন বাংলাদেশে দু’টি প্রস্তাবিত ও নির্ধারিত সফর বাতিল করেছিলেন। তা সত্ত্বেও দিল্লির প্রভাবে ওয়াশিংটন ঢাকার প্রতি তার বিরক্তির বাড়াবাড়ি হতে দেয়নি। গত সপ্তাহে (৫ মে) একই দিনে হিলারি কিনটন আর ভারতের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সংক্ষিপ্ত সফরে হলেও ঢাকা আগমন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। 

হিলারির ক্রোধের কি উপশম হয়েছে?
হিলারি ঢাকা এসেছিলেন চীন থেকে। তার বেইজিং সফরের সময় অন্ধ মানবাধিকার আইনজীবী চেনের ব্যাপার নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে লক্ষণীয় উত্তেজনা দেখা দেয়। হিলারির আসল উদ্দেশ্য তাতে কতখানি প্রভাবিত হয়েছে বলা কঠিন। বাহ্যতই তিনি অর্থনৈতিক বিষয়াদি (মূলত চীনের কাছে আমেরিকার বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি ও ঋণ) এবং সাধারণভাবেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে চীনের সাথে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। তা ছাড়া চলতি বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার কার্যকাল শেষ হয়ে যেতে পারে। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বন্ধু ও পরিচিতদের তিনি বিদায় সম্ভাষণ জানাতে চাইবেন।
কিন্তু আরেকটা ব্যাপার এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করে চলেছে। ভারত মহাসাগরে বেশ ক’টি নৌঘাঁটি তৈরি করেছে সে। এতদঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক প্রভাব অত্যধিক বেড়ে যাক সেটা ওয়াশিংটনের কাম্য নয়। আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়া নিয়ে বেইজিংয়ের সাথে একটা স্বাভাবিক বৈরিতা ভারতেরও আছে। তবে চীনের সাথে ভারতের ঐতিহাসিক বিরোধ হচ্ছে সীমান্ত নিয়ে। বিশেষ করে অরুণাচলের বিস্তীর্ণ এলাকার মালিকানা নিয়ে ১৯৬২ সালের নভেম্বরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে, কিন্তু কোনো মীমাংসা হয়নি। এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটা বলয় ও বেষ্টনী তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অভিন্ন স্বার্থ।
সোভিয়েট ইউনিয়নের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও আমেরিকা অনুরূপ একটা বেষ্টনী তৈরি করেছিল। তখন ভারত ছিল সোভিয়েটের প্রধান মিত্র। মার্কিন বেষ্টনী সে জন্য তৈরি হয়েছিল অবিভক্ত পাকিস্তানকে নিয়ে। কেন্দ্রীয় চুক্তি সংস্থা সেন্টো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিয়াটোতে পাকিস্তান সদস্য হয়েছিল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৯৭০-৭১ সালে বেইজিংয়ের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে অনেক উন্নতি হয়। সোভিয়েট ইউনিয়ন ধসে পড়ার পর ওয়াশিংটনের মনোযোগ পড়ে চীনের দিকে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ নিয়ে মত ও পথের ভিন্নতার কারণে পাক-মার্কিন সম্পর্ক এখন বড়জোর একটা ‘ক্ষুব্ধ পারস্পরিক সহনশীলতার’ স্তরে নেমে এসেছে। তা ছাড়া পাকিস্তান এখন চীনের সাথে বন্ধুত্বকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে। 
আরো একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার। চীনের বিরুদ্ধে তারা মিত্র হলেও ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে পারস্পরিক একটা রেষারেষিও আছে তাদের মধ্যে। বিগত কয়েক বছরে ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে দেখেছে দিল্লির চোখ দিয়ে। দিল্লির প্রতি নতজানু ভাব দেখে মার্কিনিরা ধরেই নিয়েছিল যে, বাংলাদেশ মার্কিনিদের নতুন মিত্র ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে না। কিন্তু অতি সম্প্রতি এতদঞ্চলে ওয়াশিংটনের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। 

উপদেশের পরিস্থিতিতে তৃতীয় মাত্রা
মিয়ানমারের সেনাশাসকেরা খুবই সীমিত আকারে কিছু রাজনৈতিক সংস্কার করেছেন। তাদের এক ইঞ্চি সংস্কারের বিনিময়ে ওয়াশিংটন ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা ইতোমধ্যে কয়েক গজ পুরস্কার দিয়ে দিয়েছে মিয়ানমারকে। ওয়াশিংটন আশা করছে, বিনিময়ে চীনের প্রভাব কাটিয়ে মিয়ানমার পশ্চিমের দিকে ঝুঁকবে। তেমন অবস্থায় চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন বলয়টি বাংলাদেশ হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রসারিত হবে। তা ছাড়া মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে বিপুল গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় মার্কিন তেল কম্পানিগুলো এখানে বিনিয়োগে নেমেছে। এই বিনিয়োগ রক্ষার নামে বঙ্গোপসাগরে একটা ‘ফুটপ্রিন্ট’ স্থাপন ওয়াশিংটনের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হবে। অর্থাৎ ভারতের চোখ দিয়ে দেখার পরিবর্তে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে ওয়াশিংটন এখন সরাসরি নিজের চোখ দিয়েই দেখবে। হিলারি কিনটন ও প্রণব মুখার্জির সংক্ষিপ্ত সফরকে এ আলোকেই দেখতে হবে। 
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানেই যার সাথে কথা বলেছেন, সবাইকে তিনি বলে দিয়েছেন, আগামী বছর সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চায় ওয়াশিংটন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠকে এবং অন্যত্রও তিনি বলেছেন, সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য বড় দুই দলকে সংলাপে বসতে হবে। ১৮ দলের জোটের প্রতিনিধি খালেদা জিয়া এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্যার ফজলে হাসান আবেদ প্রমুখ যাদের সাথে তার দেখা হয়েছে, তারা সবাই হিলারিকে পষ্টাপষ্টি বলে দিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি ছাড়া গত্যন্তর নেই।
হিলারি নিজেও কিছু স্পষ্ট কথা বলে গেছেন শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে। তিনি বলে গেছেন, ইলিয়াস আলীর নিরুদ্দেশ হওয়া এবং বস্ত্র শ্রমিকদের নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যা সম্বন্ধে তদন্ত হতে হবে। (প্রায় একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নও বলেছে, গুম আর খুনের ঘটনাগুলো বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক লেপন করছে।) বাংলাদেশে মানবাধিকারের শোচনীয় অবস্থা সম্বন্ধেও হিলারি সরকারকে তম্ভি করে গেছেন। সরকারকে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছেন, গ্রামীণ ব্যাংককে অনুপযুক্ত কারো হাতে ন্যস্ত করা ওয়াশিংটনের গ্রহণযোগ্য হবে না। ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধিদের তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, আমিনুল ইসলামের হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন না হলে মার্কিন আমদানিকারকেরা বাংলাদেশকে সুনজরে দেখবে না অর্থাৎ বাংলাদেশের রফতানি (বিশেষ করে বিনা শুল্কে রফতানি) বৃদ্ধি পাবে না। 

প্রণব মুখার্জির নতুন বোধোদয়?
সবচেয়ে বড় কথা, হিলারি কিনটন বাংলাদেশ সরকারের আয়োজিত নৈশভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে তিনি জানিয়ে দিয়ে গেলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ওপর ওয়াশিংটন মোটেই প্রীত নয়।
প্রণব মুখার্জি বাহ্যত এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের যবনিকাপাত করতে। কিন্তু মনে হচ্ছে, সেটা অছিলামাত্র ছিল। কিছু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথাও তিনি ঘোষণা করেছেন। যেমন গত বছর বাংলাদেশকে ১.৭৫ শতাংশ সুদে দেয়া ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের ২০ কোটি মওকুফ ঘোষণা করেছেন তিনি এবং বলেছেন, সুদের হারও কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে। মনে হচ্ছেÑ এখানে কিছু ছাড় দিয়ে ভারত করিডোর, ট্র্যানজিট এবং বাংলাদেশী বন্দরগুলোর ব্যবহারও অনুদান হিসেবেই পেতে চায় বর্তমান সরকারের কাছ থেকে। প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের সাথে পুরনো চুক্তিগুলো কার্যকর করার লক্ষ্যে সর্বভারতীয় জনমত সৃষ্টি করতে চায়। 
দুই দেশের সম্পর্কে সব কিছুই যে সঠিক পথে যাবে না এ উক্তি থেকেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ৬৫ বছর ধরে ভারত বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশী জমি ও ছিটমহল ইত্যাদি দখল করে আছে। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির শর্তগুলোও ভারত পালন করেনি। দিল্লির দিক থেকে বক্তব্য : সব অঙ্গরাজ্যের সম্মতি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যাচ্ছে না। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফর উপলক্ষে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। শেষ মুহূর্তে সই করা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশকে সামান্যতম পানি দেয়ার ব্যাপারেও বেঁকে দাঁড়িয়েছিলেন। সমস্যা হচ্ছেÑ দিল্লি এ রাজ্য-সে রাজ্যের অজুহাত দেখিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি কার্যকর করছে না এবং লোকসান হচ্ছে বাংলাদেশের। এমন অনির্ভরযোগ্য চুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রণব মুখার্জির সফরের পরে দিল্লিতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে। সেখানেও বাংলাদেশকে কোনো আশার বাণী শোনানো হয়নি।

সুস্থ পরিবর্তন?
প্রণব বাবু এর আগে কোনো কোনো সফরে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ না করে কূটনৈতিক অসৌজন্য দেখিয়েছিলেন। আলোচ্য সফরে তিনি বেগম জিয়ার সাথে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করেছেন। আর একটা আশার কথা তিনি শুনিয়ে গেছেন এ সফরে। তিনি বলেছেন, ভারত বন্ধুত্ব করতে চায় বাংলাদেশের সাথে, বিশেষ কোনো দলের সাথে নয়। এত দিন পর্যন্ত ভারতীয় মন্ত্রীদের মধ্যে প্রণব বাবুই বেশি সোচ্চারভাবে বলতেন, ভারত শেখ হাসিনাকে গদিতে বহাল রাখবে। বাংলাদেশে কোন দল নির্বাচনে জয়ী হবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন ইত্যাদি সব ব্যাপারে ভারত যদি প্রকৃতই হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে সেটা প্রকৃত সুসম্পর্কের জন্য সহায়ক হতে পারে।
হিলারি ও প্রণবের সফরের পর থেকে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কৌতুককর। সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের রণহুঙ্কার কিছুটা কমেছে। শাসক দলের মহাসচিব সংলাপের প্রয়োজন স্বীকার করে নিয়েছেন বলেই মনে হয়। ওদিকে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে এক সপ্তাহের জন্য হলেও আগাম জামিন দেয়া হয়েছে। মার্কিন ও ভারতীয় মন্ত্রীদের সফরকে সম্মান দেখিয়ে এগুলো বিএনপি নেতাদের ফাঁদে ফেলার জন্য আওয়ামী লীগের চালও হতে পারে। অন্য দিকে বিএনপির যে মহলটি আন্দোলনের বিপক্ষে তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা লঙ্কা বিজয় করে ফেলেছেন। সেটা খুবই ভুল হচ্ছে বলে ধারণা। 
খুব সম্ভবত এ কৌশল আওয়ামী লীগ নিচ্ছে বিএনপির আন্দোলনকে শুধু ঝিমিয়ে দেয়া নয়, ঘুম পাড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে। আন্দোলন করে তারা যে বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে পারে, সেটা প্রমাণ করা বিএনপির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসের অধিকাংশ সময় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চোখ রাঙিয়েছে, আন্দোলনের ভয় দেখিয়েছে। আওয়ামী লীগের সে দেমাগ অক্ষত থাকতে দেয়া কিছুতেই উচিত হবে না। বিদেশের চাপে পরবর্তী নির্বাচনে যদি বিএনপি এবং ১৮ দলের জোট জয়ীও হয়, তাহলেও কথা থেকে যাবে কত দিন তারা খালেদা জিয়াকে শান্তিতে শাসন করতে, গদিতে টিকে থাকতে দেবে। গণ-আন্দোলনের জোয়ার পুরোপুরি থিতিয়ে পড়ার আগে ১৮ দলের জোটের নেতাদের উচিত হবে এ সরকারকে শেষ ধাক্কা দেয়া, এটা প্রমাণ করা যে, ভবিষ্যতে আর আন্দোলন-হরতালের হুমকি দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে পারবে না।
সরকার এখনো তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি ফিরিয়ে আনেনি। ইলিয়াস আলীকে তারা এখনো মুক্তি দেয়নি। শীর্ষ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলাগুলো এখনো তুলে নেয়া হয়নি। বরং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রমুখ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আন্দোলনে ঢিল দিলে বিএনপি নেতারা দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হবেন। তাদের কথায় বিশ্বাস করে কেউ আর কখনো আন্দোলনে যাবে না। 
(লন্ডন, ০৯.০৫.১২) 
serajurrahman34@gmail.com

মঙ্গলবার, ৮ মে, ২০১২

‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ রাজনীতি এখন আর সম্ভব নয়



সিরাজুর রহমান
গভীর সঙ্কটে এখন বাংলাদেশ। সঙ্কট সবারই। সরকারের সামনে মহাচ্যালেঞ্জ। তারা গদি চিরস্থায়ী করতে চায়। সেজন্য তাদের প্রয়োজন ভারতের কাছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ এবং নিজেদের আত্মাকেও বিকিয়ে দেয়া। দেশের মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জ : তারা সীমাতীত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা হাতছাড়া হতে দেবে না। সরকারবিরোধী বিএনপি এবং গণতন্ত্রকামী ১৮ দলের জোটের জন্য চ্যালেঞ্জ : যে কোনো মূল্যে তারা এই ফ্যাসিস্ট সরকারের অসদুদ্দেশ্য প্রতিহত করবেই।
সরকার এখন মরিয়া। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনে জনসাধারণ যেমন সংগঠিত ও সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছে ছলে-বলে-কৌশলে সেটাকে দলন করা না গেলে গদি আর টেঁকে না। শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর ভারতে নির্বাসিত ছিলেন। তখন তার ও তার বোনের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল গোয়েন্দা সংস্থা র’য়ের ওপর। অনেকে বলেন, সে সময় র‘ তার মগজ ধোলাই করে দিয়েছিল। ভারতের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু তাঁর মাথায় ঢোকে না। গদি পাওয়ার দিনটি থেকে তিনি সব বিরুদ্ধ রাজনৈতিক সত্তাকে বিলুপ্ত করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন।
বিরোধী দলকে সভা-সমিতি কিংবা মিছিল করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো অপকৌশলই বাদ দেয়া হয়নি। সরকারের বিরোধী ও সমালোচক হাজার হাজার নেতাকর্মীকে খুন করা কিংবা কয়েদ করে রাখা হয়েছে। ভারত ও আমেরিকার সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় ইসলামী সন্ত্রাসী অপবাদ দিয়ে টুপি-দাড়ি-পরিহিত অজস্র বিশ্বাসীকে বন্দী করা হয়েছে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে সরকারবিরোধী ইসলামপন্থী রাজনীতিকদের জেলে ও রিম্যান্ডে নির্যাতন করা হচ্ছে।
প্রধান বিরোধী বিএনপি দলে আন্দোলনের মত ও পথ নিয়ে মতদ্বৈধের কারণে অথর্ব ও স্বাধীনতার দুশমন সরকারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা গ্রহণে অহেতুক বিলম্ব করে সুযোগ ও ইনিশিয়েটিভ হাতছাড়া করা হয়েছে। ছোটখাটো গণতান্ত্রিক দলগুলো স্বতন্ত্র অস্তিত্বের দম্ভের কারণে ঐক্যবদ্ধ হতে অযথা বিলম্ব করেছে। সুযোগকে প্রথম সুযোগেই গ্রহণ করতে হবে—এ মর্মে প্রবাদ বহু দেশে বহু ভাষাতেই আছে। কিন্তু সেগুলো এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের কানে পৌঁছায়নি বলেই মনে হয়। সরকার সে সুযোগে গণতন্ত্রের সব পথে পদে পদে ব্যারিকেড গড়ে তুলেছে। যতই দিন যাচ্ছে বিরোধী দলগুলোর কাজ ততই দুরূহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জনসাধারণ গোড়া থেকেই এ সরকারকে চিনে ফেলেছে। দশ টাকা কেজির চাল, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুত্, বিনামূল্যে ফার্টিলাইজার ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি যে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-সংসদ সদস্য, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের রাতারাতি ধনকুবের বানানোর অজুহাত ছিল সেটা বুঝে উঠতে কারও কষ্ট হয়নি। এটাও তারা বুঝে গেছে যে, মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি শুধুই জনসাধারণকে প্রতারণা করার ছল ছিল। কিন্তু যখন থেকে তারা বুঝতে পেরেছে যে তাদের স্বাধীনতা বিপন্ন, ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি‘ লেখা নামাবলী গায়ে দিয়ে এ সরকার তাদের দেশকে ভারতের হাতে তুলে দিতে উদ্যত হয়েছে, তখন থেকে সাধারণ মানুষও আন্দোলনমুখী হয়ে উঠেছে, এ সরকারের অসদুদ্দেশ্যগুলো প্রতিহত করতে তারা রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত হয়েছে। খালেদা জিয়ার গণতন্ত্রের আন্দোলনে ষোলআনা সমর্থনের এই হচ্ছে কারণ।

নির্যাতনের মানচিত্র
গদি হারানোর ভয়ে উন্মাদ হয়ে উঠেছে সরকার। অত্যাচার নির্যাতন হিটলারের ফ্যাসিস্ট নািসদেরও হার মানাতে চলেছে। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি নানা নামে বিনাবিচারে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাব অনুযায়ী বিচার-বহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল ১৫৪, ২০১০ সালে ১২৭ এবং ২০১১ সালে ৮৪ জন। গত মাসে (এপ্রিল) বিচার-বহির্ভূতভাবে খুন হয়েছে ১১ জন। আন্তর্জাতিক সমালোচনার তোড়ে তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যার সংখ্যা হ্রাস করা হলেও গুম করে খুনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০০৯ সালে গুম হয়েছিল ২ জন। ২০১০ সালে সে সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ১৮ আর ২০১১ সালে ৩০ জন। এ যাবত্ গুম হওয়াদের সংখ্যা ১২২-এ দাঁড়িয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাবে জানা যাচ্ছে।
সর্বশেষ গুম হয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। তিনি বরাক নদীর ওপর ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ তৈরির বিরুদ্ধে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন; তিতাস নদী আর ১৪টি শাখা নদী ও খালে বাঁধ বেঁধে উত্তর-পূর্ব ভারতে যন্ত্রপাতি কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর জন্য বিশাল বিশাল ট্রেইলার পাঠানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। অনেকের মতে, তাঁকে গুম করার পেছনে আরও একটা বড় কারণ আছে। এ ঘটনার আগে আগেই রেল মন্ত্রণালয়কে ঘিরে বিরাট একটা দুর্নীতি ধরা পড়ে যায়। মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারী একান্ত সচিবের গাড়ি থেকে গভীর রাতে ৭০ লাখ (কোনো কোনো খবর অনুযায়ী চার কোটি ৭০ লাখ) টাকা পাওয়া যায়। সে গাড়িতে আরও ছিলেন বাংলাদেশ রেলের পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক এবং নিরাপত্তা প্রধান। সে রাতে এবং পরদিন তারা সবাই বলেছিলেন যে, সে গভীর রাতে তারা যাচ্ছিলেন রেলমন্ত্রীর বাসায়।
সুরঞ্জিত ও সরকার গোড়ায় দুর্নীতির এই রাঘব বোয়ালকে চাপা দিতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। সে চেষ্টা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টার মতোই ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। শোনা যায় বিব্রত পরিস্থিতি এড়াতে হাসিনা আগে থাকতেই সুরঞ্জিতের পদত্যাগ চেয়েছিলেন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে সীমান্তের ওপার থেকে। পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গভীর রাতে আবার তাকে মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দেয়া হলো। শোনা যায় তার আগে আগেই ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেছিলেন।
সুরঞ্জিতের দুর্নীতি এবং ইলিয়াসকে গুম
সভ্য দেশে হলে এ কেলেঙ্কারির কারণে শুধু সুরঞ্জিতই নন, গোটা সরকারকেই পদত্যাগ করতে হতো। বর্তমান বাংলাদেশকে সুসভ্য দেশ বলতে হলে এ দেশের বর্তমান সরকারকে অসভ্য বলতেই হবে। অন্যায় স্বীকার করে পদত্যাগ করার মতো মাহাত্ম্য এ সরকারে কারও আছে বলে বিশ্বাস করা যায় না। অনেকেই বিশ্বাস করেন, সুরঞ্জিতকে নিয়ে কেলেঙ্কারি থেকে জনমতকে ভিন্নমুখী করা ইলিয়াস আলীকে গুম করার আরও একটা কারণ ছিল।
বাংলাদেশের মন্ত্রীরা হয় এদেশ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, নতুবা তারা মিথ্যা কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি আরও একবার সেটা প্রমাণ করলেন। তিনি বলেছেন, ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া উদ্বেগের ব্যাপার হলেও দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগের বিষয় নয়। মানুষকে ছিনতাই করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, কারও কারও লাশ পাওয়া গেলেও অধিকাংশেরই আর কোনো সন্ধান মিলছে না—এসব যদি উদ্বেগজনক মানবাধিকার পরিস্থিতি না হয় তাহলে দীপু মনির আবার স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কিছু লেখাপড়া শিখে আসা উচিত। দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে অজ্ঞতা ও হৃদয়হীনতার সংমিশ্রণ ঘটেছে। বিশ্বসমাজ অনেক আগেই বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাপানের উপপ্রধানমন্ত্রী ওকাদা গত শুক্রবার ঢাকা বিমানবন্দরেই সাংবাদিকদের বলে গেছেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতিতে কিছু সমস্যা আছে।’ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় দীপু মনির উপস্থিতিতেই বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যা আর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য অনুরোধ করেছেন। ড. ইউনূস এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে বৈঠকে হিলারি বলেছেন, আমিনুল ইসলামের হত্যা সম্বন্ধে তদন্তে সরকারের ব্যর্থতা মার্কিন ক্রেতাদের কাছে ভুল সঙ্কেত পাঠাবে। নির্লজ্জ এবং হৃদয়হীন না হলে দীপু মনি বলতে পারতেন না, ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগের বিষয় নয়।’
ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মন্ত্রীদের উল্টোপাল্টা এবং পরস্পরবিরোধী উক্তি বস্তার ভেতর ছুঁচোদের উন্মাদ ছুটোছুটির কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোড়ায় বলেছিলেন, ইলিয়াস আলী খালেদা জিয়ার নির্দেশে আত্মগোপন করে আছেন। গত বুধবার সন্ধ্যায় ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনা গণভবনে স্বামীর মুক্তির প্রার্থনা নিয়ে শেখ হাসিনার পায়ে লুটিয়ে পড়েন। সে হৃদয়বিদারি পরিস্থিতিতে হাসিনা লুনাকে বলেছিলেন যে তার স্বামীর সন্ধান করা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কর্তব্য।
কিন্তু তার আগেই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মন্নুজান ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে বিধবা বলে উল্লেখ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন যে ইলিয়াসকে জীবিত উদ্ধারে সরকার আশাবাদী। আর দলের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেছেন, ‘নিজের সৃষ্ট সন্ত্রাসের দ্বারাই ইলিয়াস আলী খুন হয়েছেন।’ এ কয়টি উক্তি থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে এ সরকার, এ মন্ত্রিসভাকে কিছুতেই সুগঠিত কিংবা সুশৃঙ্খল বলা যাবে না। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ হয়তো ঠিকই বলেছেন যে ইলিয়াস আলীর খবর জানেন একমাত্র শেখ হাসিনা। কেননা, কোনো কোনো তথাকথিত নিরাপত্তা সংস্থার কাজকর্ম সম্বন্ধে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও কিছু জানেন বলে মনে হয় না।

গণতন্ত্রের আন্দোলন
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এ সরকারের বিরুদ্ধে বর্তমান পর্যায়ের আন্দোলন ও হরতাল শুরু করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবিতে। দেশের অন্যতম শীর্ষ আইনবেত্তা ড. কামাল হোসেন গত সপ্তাহে আবারও দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যে রায়ে আদালত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী তথা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল করেছিলেন সে একই রায়ে আদালত আরও বলেছিলেন যে দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আগামী আরও কয়টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে হতে পারে। কিন্তু রায়ের এ অংশের পরোয়া না করেই সরকার সে পদ্ধতি বাতিল করে দেয়।
স্মরণীয় এই যে, ১৯৯৬ সালে এ পদ্ধতির দাবিতে শেখ হাসিনা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে হরতাল ও আন্দোলন করেছিলেন এবং সে আন্দোলনে প্রচুর রক্ত ঝরেছিল। সে পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার যে আদাজল খেয়ে লেগেছেন তার কারণ বুঝতে কারও বাকি নেই। দলীয়কৃত প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর পরিচালনায় সাজানো-পাতানো নির্বাচন ছাড়া হাসিনা ও তার সরকারের জয়ের কোনো সম্ভাবনাই নেই। বিএনপির আন্দোলনে দেশের সব অঞ্চলের মানুষ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। সব আকারের গণতন্ত্রমনা দলগুলোর জোট গঠনের ফলে আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়া সরকারকে ‘আলটিমেটাম’ দিয়েছিলেন ১০ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা না হলে তারা সরকারের পতনের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করবেন।
তারপর থেকে পরিস্থিতির নাটকীয় ও শোচনীয় অবনতি ঘটেছে। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি ইলিয়াস আলীকে গুম করা মাত্র একটা ব্যাপার। ইলিয়াসকে গুম করার বিরুদ্ধে ১৮ দলের জোটের প্রতিবাদ মিছিলের ভেতরে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা ঢুকে একটা নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন স্বয়ং স্বীকার করেছেন, প্রতিপক্ষের হরতাল ঠেকাতে তিনি এই ক্যাডারদের নামিয়েছেন। তারা বিশ্বনাথে তিনজন, লক্ষ্মীপুরে একজনসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েকজনকে হত্যা করেছে। বিশেষ করে বিশ্বনাথে প্রমাণ হয়েছে, যে বুলেটে বিরোধী জোটের কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ কিংবা র্যাবের অস্ত্রশস্ত্রে সেসব বুলেট ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
শাসক দলের চররা মিছিলের ভিড় থেকে সচিবালয়ে ককটেল বোমা ছুড়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের কাছে একখানি গাড়িতে আগুন লাগিয়েছে এবং এ জাতীয় আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে পুলিশ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদসহ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করেছে এবং দলের প্রায় সব শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে তাদের বাসভবনে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে। অধিকাংশ নেতাই সরকারের মতলব বুঝতে পেরেছেন, অন্য কোথাও সরে থেকেছেন।
সরকারের উদ্দেশ্য অবশ্যই ছিল নেতাদের (ব্রিটিশ আমলের মতো) জেলে পুরে রাখলে নেতৃত্ব ও নির্দেশনার অভাবে আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়বে। বাস্তবেও অনেকেরই এখন সে আশঙ্কা। মে দিবস এবং হিলারি ক্লিনটন ও প্রণব মুখার্জির সফর উপলক্ষে ১৮ দলের হরতাল স্থগিত রাখা হয়েছে। সবাই স্বীকার করবেন, গণআন্দোলনের প্রকৃতি এই যে অগ্রগতি স্থগিত করা হলে সে আন্দোলনের তীব্রতা হ্রাস পায়।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আন্দোলন স্থগিত রাখা কিংবা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া না হলে জনগণ নিজেরা উদ্যোগী হয়েই আন্দোলন চালিয়ে যেতে সক্ষম। গান্ধী-নেহরু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ব্রিটিশরা কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে জেলে পুরে রাখলেও আন্দোলন স্তিমিত হয়নি। একাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান গোটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশায় সহযোগিতা করে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সবাই পালিয়ে গিয়ে দিল্লি সরকারের অতিথি হয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ থেমে যায়নি, মেজর জিয়াউর রহমান প্রমুখ বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা ও কিছু বুদ্ধিজীবীর অনুপ্রেরণায় সাধারণ মানুষও দেশ স্বাধীন করতে এগিয়ে এসেছিল, স্বাধীনতার জন্য তারা প্রাণ দিয়েছিল।

রিমান্ডের নির্যাতন
অতীতে যেমন দেখা গেছে, এবারও কোনো কোনো মহল সরকারের হয়ে নির্লজ্জ দালালি শুরু করে দিয়েছে। এ সরকারের আমলে লাভবান হয়েছেন এফবিসিসিআইর সদস্যরা। শান্তিতে মুনাফার অঙ্ক বৃদ্ধি করে যাওয়ার লক্ষ্যে এ সংস্থা হরতাল নিষিদ্ধ করে আইন করার দাবি জানিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় হরতাল কেউই চায় বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু যে যে কারণে হরতাল হচ্ছে সে কারণগুলো দূর করার জন্য কী করেছেন এফবিসিসিআইয়ের সদস্যরা? হিলারি ক্লিনটন যে কূটনৈতিক ভাষায় বলে গেলেন, আমিনুল ইসলামের হত্যার তদন্ত না হলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পাবে না, সে ব্যাপারে কী করছে এফবিসিসিআই? দলীয়কৃত পুলিশ-র্যাব আর আওয়ামী লীগের ক্যাডারগুলো যে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করছে সে ব্যাপারে কী করছে তারা? অথবা পাইকারি ধরপাকড় ও ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে?
বিএনপি ও ১৮ দলের জোটের নেতারা বলছেন গ্রেফতারের ভয়ে নয়, রিমান্ডের ভয়েই তারা ধরা দিচ্ছেন না। সেটা অবশ্যই সত্যি কথা। বর্তমান সরকারের আমলে গ্রেফতার ও বিচারের মধ্যবর্তী পর্যায়ে রিম্যান্ড নামক নতুন একটা নির্যাতনযন্ত্র সংযুক্ত হয়েছে। বিচারের আগেই বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়, তাতে নিশ্চয়ই সরকারের শীর্ষ নেতাদের কারও কারও গায়ের জ্বালা মেটে। দেশের মানুষ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি যে রিমান্ডে নির্যাতন চালিয়ে তারেক রহমানের কোমর ভেঙে দেয়া হয়েছিল। সে অবস্থার জন্য এখনও তার চিকিত্সা চলছে।
নেতাদের ভয়ভীতি ও আশঙ্কার প্রতি জনসাধারণের ষোলআনা সহানুভূতি আছে। কিন্তু এটাও সত্যি যে ১০ জুন পর্যন্ত ঝিমিয়ে পড়ে থাকলে আন্দোলন অবশ্যই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তারপরে আবার আন্দোলনে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। আমার মনে হয়, এ অবস্থায় নেতাদের উচিত জনসাধারণকে আগেভাগেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়া। সে নির্দেশগুলো হবে : তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার ঘোষণা, ইলিয়াস আলীকে জীবিত ফিরিয়ে দেয়া, আটক নেতাদের মুক্তি ও তাদের প্রতি ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করা এবং জামিন প্রভৃতি বিচার পদ্ধতিতে বাধা দেয়ার জন্য র্যাব ও পুলিশ দিয়ে উচ্চ আদালতের বেষ্টনী তুলে নেয়া পর্যন্ত লাগাতার হরতাল ও আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
তারপর নেতারা সর্বসাধারণের সামনে এবং সম্ভব হলে সভা-সমাবেশ ডেকে সদলবলে গ্রেফতারবরণ করতে পারেন। তাতে বিশ্বব্যাপী জোরালো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। তেমন অবস্থায় এ সরকারও খুব সম্ভবত তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে সাহস পাবে না। তাছাড়া সাময়িকভাবে গ্রেফতার এড়াতে পারলেও তাদের কেউ কেউ যে ‘গুম’ হবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়? মনে রাখতে হবে ‘গুম’ হওয়ার চাইতে গ্রেফতার হওয়া অনেক ভালো। তাছাড়া সাধারণ মানুষ যেখানে অহরহ নির্যাতিত হচ্ছে সেখানে নেতারা নির্যাতনের ভয়ে আত্মগোপন করে থাকলে জনমনে ভালো ধারণা সৃষ্টি হয় না। (লন্ডন, ০৬.০৫.১২)
serajurrahman@btinternet.com

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

অন্যায়ের দেশ- আজকের বাংলাদেশ

অন্যায়ের দেশÑ আজকের বাংলাদেশ


॥ সিরাজুর রহমান ॥

কলকাতায় আমার স্কুলজীবনের শেষ দু-তিন বছর অনেক দেখেছি। তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে দু-একটা করে আন্দোলন হতো নানা অসিলায়। আসল লক্ষ্য অবশ্যই ছিল ব্রিটিশদের তাড়াতে হবে, ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে হবে। প্রায়ই দেখা যেত মিছিলের ভিড় থেকে কেউ একজন পুলিশের দিকে একটা ঢিল ছুড়ল। আর যায় কোথায়! দ্রুম-দ্রাম গুলিবর্ষণ শুরু করল পুলিশ, কিছু লোক লুটিয়ে পড়ল, পিচ ঢাকা কালো রাস্তা লাল হয়ে গেল তাজা রক্তে।
কথাটার উৎপত্তি ফরাসি ভাষা থেকেÑ অ্যাজাং প্রভকেৎররাÑ পুলিশের গোয়েন্দা কিংবা ভাড়া করা লোক, যারা উসকানি দিয়ে জনতাকে দুষ্কৃত করতে এবং পুলিশকে গুলি চালানো এবং অন্যান্য নির্যাতনে প্ররোচনা দেয়। বর্তমান বাংলাদেশে ব্যাপারটা অহরহ ঘটছে। এখানে ঢাকঢাক গুড়গুড়ের প্রয়োজন নেই। পুলিশে আর শাসক দলের গুণ্ডাতে কোনো তফাত নেই। উভয়েরই লক্ষ্য হলো দেশে যারা গণতন্ত্র চায় এবং যারা ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রী শাসনের অবসান চায়, যেকোনো প্রকারেই হোক তাদের নিরস্ত করতে হবে, এমনকি খুন করে হলেও। শাসক দলের গুণ্ডারা বেকায়দায় পড়লে আজকের বাংলাদেশে পুলিশ তাদের সংরক্ষণ দেয়। এই হচ্ছে তফাত।
সে কালের মানুষ ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক কুশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। যেকোনো ত্যাগের বিনিময়ে তারা ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে বদ্ধপরিকর ছিল। বহু খুন করে, বহু রক্ত ঝরিয়েও ব্রিটিশরা তাদের নিরস্ত করতে পারেনি। আজকের বাংলাদেশের মানুষ একটা ব্যর্থ, অপদার্থ, নির্যাতক আর একটি বিদেশী রাষ্ট্রের অঙ্গুলি তাড়নে পরিচালিত সরকারকে বিতাড়িত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দলীয়কৃত পুলিশ, ঘাতক দল এবং সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দাদের অত্যাচার-নির্যাতনে তারা নিরস্ত হবে না।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান ক্ষমতাসীন সরকারের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বেলায়? দেশের মানুষ মনে করে বিগত সাড়ে তিন বছরে হাজার হাজার প্রাণহানি হয়েছে সরকারের নির্দেশে। এ সরকার গদি চিরস্থায়ী করতে চায়। অন্য কোনো বিবেচনা তাদের মাথায় আসে না। দায়িত্ববোধের তো প্রশ্নই ওঠে না। এই যে হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হলো এই সাড়ে তিন বছরে, তার কোনো একটির সুরাহা হয়েছে কি? 
স্বামী-স্ত্রী দু’জন সাংবাদিক খুন হলেন। মেহেরুন রুনি আর সাগরের পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি করলেন, ঢাকঢোল পিটিয়ে মিডিয়াকে বললেন, তিনি তার দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু শিশুটিকে যারা পিতৃ-মাতৃ হারা করল তাদের কী শাস্তি হলো? খুনিরা কি ধরা পড়ল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনি খুনিদের পাকড়াও করবেন। বহু ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর আবারো ঢাকঢোল পিটিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, রুনি আর সাগরের ঘাতকদের গ্রেফতারের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কী লাভ হলো তাতে? হাইকোর্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ডেকে তম্ভি করলেন, তারা বললেন, খুনিদের গ্রেফতারে তারা অপারগ, তারপর দায়িত্ব দেয়া হলো র‌্যাবকে। র‌্যাবই বা কী ভোজবাজি দেখিয়েছে? আমরা গোড়ার দিন থেকে বলে এসেছি, সাংবাদিক দম্পতির খুনের কোনো সুরাহা হবে না, খুনিরা ধরা পড়বে না, কেননা তারা সরকারের হুকুমের লোক, সরকারের ভেতরের কারো না কারো নির্দেশে সরকারের ভেতরের দুর্নীতির খবর ফাঁস করা বন্ধ করার মতলবে তাদের খুন করা হয়েছে। প্রমাণ হয়ে গেল দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি আসলে ছিল সত্য ধামাচাপা দেয়ার কারসাজি।
ইলিয়াস আলী গুম হয়েছেন দুই সপ্তাহ হতে চলল। তার ওপর সরকারের ও তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের আক্রোশ অবশ্যই ছিল। ইলিয়াস প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন, তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, বৃহত্তর সিলেটে আওয়ামী লীগের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। সরকারের পৃষ্ঠপোষক দেশ ভারত অভিন্ন নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়, নদীগুলোর মধ্যে সংযোগ খাল তৈরি করে সেসব নদীর পানি মধ্য ভারতে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ মরুভূমি হয়ে যাক তাতে তাদের কিছু আসে-যায় না। তারা টিপাইমুখে বরাক নদীর ওপর বাঁধ তৈরি করছে। 
হাসিনার সরকারের মুখ থেকে প্রতিবাদের টুঁ শব্দটিও উচ্চারিত হচ্ছে না। ইলিয়াস আলী বৃহত্তর সিলেটে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করলেন, লাখ লাখ লোক সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ জানাল। উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারী যন্ত্রপাতি এবং হয়তো ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে ভারতীয়রা বাংলাদেশের ভেতরে এসে তিতাস নদী ও ১৪টি খালে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিলো। তার বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ কণ্ঠ উচ্চারিত হলো ইলিয়াস আলী তাতেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। দেশে ও বিদেশে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, প্রায় সবাই বলছে, তার গুম হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগ সরকার এবং র‌্যাবের হাত আছে। 
কেন? র‌্যাব এর আগেও শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গুম করেছে এবং সরকারের নীরবতা দেখে প্রমাণ হচ্ছে, সরকার ও শাসক দলের নির্দেশে এই গুম ও খুন করার ঘটনাগুলো ঘটছে। অন্তত এটা তো প্রমাণ হয়েছে যে, খুনিদের খুঁজে বের করার কোনো চেষ্টা সরকারের দিক থেকে হয়নি। ইউরোপ-আমেরিকায় সংসদগুলো এবং সংসদ সদস্যরা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবিলম্বে ইলিয়াস আলীর মুক্তি দাবি করেছে। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা উল্টোপাল্টা এবং পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলছেন। ঠিক যে রকমটা করা হয়েছিল রুনি আর সাগরের হত্যার ব্যাপারে। অর্থাৎ সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার সব রকমের চেষ্টা চলছে।
ইলিয়াস আলীর শোকাতুর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যা তার মুক্তির জন্য সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তাতে কোনো ফল হয়নি। পাষাণের হৃদয় এতটুকু কম্পিত হয়নি। তার স্ত্রী উপায়ান্তরবিহীন হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। বিএনপি ও ১৮ দলের জোটের নেতারাও ইলিয়াস আলীকে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। সরকারের ইচ্ছা থাকলে কাজটা মোটেই কঠিন নয়। 

এ আন্দোলন যে কারণে অপরিহার্য 
ইলিয়াস আলীকে র‌্যাব কিংবা অন্য কোনো তথাকথিত নিরাপত্তা এজেন্সি গুম করে থাকলে সরকার হুকুম দিলেই তাকে ছেড়ে দেয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়হীন পরিহাস অনুযায়ী খালেদা জিয়ার নির্দেশে যদি ইলিয়াস আলী আত্মগোপন করে থাকেন তাহলেও এত দিনে তাকে খুঁজে বের করা পুলিশ, র‌্যাব কিংবা সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা বিভাগের উচিত ছিল। তারা দেশের সব মানুষের হাঁড়ির খবর রাখছে, দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত সরকারের বিরোধী ও সমালোচকদের খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার, গুম কিংবা খুন করছে, আর এই বিখ্যাত নেতার খোঁজ পাওয়ার সাধ্যি তাদের হলো না? উন্মাদ না হলে সে কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। 
সোজা আঙুলে ঘি বের করা না গেলে আঙুল একটা বাঁকা করতে হয় বৈকি! ১৮ দলের জোটকে সেজন্যই আন্দোলনের পথ ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এবং বিদেশী পর্যবেক্ষকেরা সবাই স্বীকার করেন, বর্তমান সরকারের আমলে বিশেষ করে বিএনপি যত আন্দোলন করেছে প্রত্যেকটি ছিল শান্তিপূর্ণ। ১২ মার্চ ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে রক্তারক্তি করার লক্ষ্যে একই দিন আওয়ামী লীগও ঢাকায় কর্মসূচি দিয়েছিল। কিন্তু সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ এড়ানোর লক্ষ্যে খালেদা জিয়া তার কর্মসূচি এক দিন পিছিয়ে দেন। কিন্তু যেখানেই আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর গুণ্ডারা ময়দানে নেমে পড়েছে, কিছু কিছু অশান্তি মাত্র সেখানেই হয়েছে।
বিদেশী মিডিয়ায় এবং ইন্টারনেটে খবর ছড়াচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের এক শ’ নেতা-কর্মীকে দেরাদুনে ভারতীয় সামরিক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদের নাম দেয়া হয়েছে ক্রুসেডার। একাদশ ও দ্বাদশ শতকে ইউরোপের খ্রিষ্টান রাজারা ফিলিস্তিনের মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন সেটাকে বলা হতো ক্রুসেড। সে নাম ধার নিয়ে আওয়ামী লীগ কি ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে? স্পষ্টতই ভারতের এ আচরণ বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ শুরু করার প্ররোচনা। ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার খবরে সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। এতে তিনজন নিহত হয়েছেন। দেখা গেছে, যে গুলিতে তারা মারা গেছে, সে গুলি ব্যবহারের উপযোগী কোনো অস্ত্র বাংলাদেশ পুলিশের নেই। তাহলে গুলি চালাল কারা? ভারতের দেয়া উন্নত অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগের ক্রুসেডাররা? 
অ্যাজাং প্রভকেৎরের (উসকানিদাতা) প্রশ্ন সে জন্যই উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, হরতালে শান্তি রক্ষা করা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়; হরতাল প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগ কর্মীরাও মাঠে নামবে। গত রবি ও সোমবারের হরতালে তারা মাঠে নেমেছে এবং ভাঙচুর, ককটেল নিক্ষেপের অনেকগুলো ঘটনা ঘটিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উক্তি আর এসব অঘটনের মধ্যে যোগাযোগ খুঁজে বের করতে দেশের মানুষের এতটুকু অসুবিধা হবে না। 

এত অন্যায় আগে কেউ দেখেছে? 
ব্রিটিশ রাজের শেষের দিনগুলোতে তাদের যেন মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। জেল-জুলুম তখন মানবতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গদি হারানোর ভয়ে আওয়ামী লীগ সরকারেরও হয়েছে সে অবস্থা। সন্ত্রাস চালিয়ে তাদের কোনো লাভ হয়নি। তারা এখন গ্রেফতার, পাইকারি মামলা, বাড়ি-বাড়ি তল্লাশি ইত্যাদি দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে। সচিবালয়ে কারা ককটেল ফাটিয়েছে? গাড়ি-বাস কারা ভাঙচুর করেছে? ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির অজুহাত হিসেবে অ্যাজাং প্রভকেৎররা যে সেসব ঘটনা ঘটায়নি তার প্রমাণ কোথায়? অপদার্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লেজুড় টুকু বলেছেন, এসব ঘটনার জন্য বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘হুকুমের আসামি। একই কারণে আওয়ামী লীগ গুণ্ডাদের, দলীয়কৃত পুলিশ ও র‌্যাবের খুন-খারাবির জন্য সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা কি হুকুমের আসামি নন?
এই সরকার গদি পেয়ে প্রথমেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৮৬টা মামলা তুলে নিয়েছিল। যাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা ছিল তারা ‘হুকুমের আসামি’ ছিলেন না, তাদের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। ১৫টি জাজ্বল্যমান দুর্নীতির মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। খুনের আসামিও ছিল অনেকে। একজন ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এইচ বি এম ইকবাল। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা ১৯৯৬ সালে খিলগাঁওয়ে বিএনপির মিছিলে গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিল। সে ঘটনার আলোকচিত্র প্রায় সব পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, টেলিভিশনে দেখানো হয়েছিল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জন খুনিকে এ সরকার এ যাবৎ মুক্তি দিয়েছে। এখন আবার আরো ২৯৭ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি আর দুষ্কৃতির মামলা তুলে নেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অবশ্যই এরা সবাই আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারী। অন্যায় আর অবিচারের এর চেয়ে জঘন্য দৃষ্টান্ত আর কোথায় পাওয়া যাবে?
ধরপাকড় আর তল্লাশি ব্রিটিশরা চালিয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের নাভিশ্বাস ওঠার পরে। পাকিস্তানিরা চালিয়েছিল একাত্তরের পঁচিশে মার্চের পরে? কী লাভ হয়েছে তাতে? ব্রিটিশ রাজ কিংবা পাকিস্তানি উপনিবেশবাদ কি টিকে থেকেছে? নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার কত দিন টিকে ছিল? এ সরকারেরও দিন শেষ হয়ে আসছে বলেই মনে হয়। গত রোববার রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় শুরু হয়েছে, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ শীর্ষ নেতাদের বাড়িতে পুলিশ হানা দিয়েছে। তার ফলাফল কী হয়েছে সরকার কি দেখতে পায়নি? সাধারণ মানুষ দেখেছে, সোমবারের হরতাল আরো বেশি সফল হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ বুঝে গেছে, তারা একটা ক্রান্তিলগ্নে এসে ঠেকেছে : হয় আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকারকে হঠাতে হবে, নয়তো এ দেশে শান্তিতে বাস অসম্ভব হয়ে যাবে, খুব সম্ভবত আবার তারা ভারতের উপনিবেশে পরিণত হবে। আওয়ামী লীগ যেমন মরণ কামড় দেয়ার চেষ্টা করছে, দেশের মানুষও এখন বেপরোয়া। তারা একটা গণ-বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
খরার মাঠে মৃতকল্প গরু যখন ঠ্যাং ছোড়াছুড়ি করে, আকাশে তখন শকুনের ঘুরপাক খাওয়া শুরু হয়। ২০০৬ সালের শেষের দিকে এই আলামত আমরা দেখেছি। ভারত আর আমেরিকা থেকে ছোট-বড় কর্মকর্তাদের পদধূলি দানের বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। দিল্লির দূত বীণা সিক্রি সুধা সদনকে তার দ্বিতীয় আফিসে পরিণত করেছিলেন। মার্কিন দূত কালা জাহাঙ্গীর বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন সচিবালয় আর সুধা সদনের মধ্যে ছোটাছুটি করে। সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ভারতে রাজনৈতিক সফর করেছেন, অর্ধ ডজন ঘোড়া উপহার নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এসবের ফলাফল ছিল একটা ষড়যন্ত্র এবং একটা মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচন। আর হ্যাঁ, ভারতের বস্তাবস্তা টাকা আর পরামর্শ। বিগত কিছুকাল থেকে মার্কিন ও অন্য বিদেশী কর্মকর্তাদের আনাগোনা আর ঢাকায় কূটনীতিকদের ছোটাছুটি সেসব কথাই মনে করিয়ে দেয়।

ভিআইপি সফর
গরিবের দুয়ারে হাতির পা। তাও আবার একটা নয়, দুই-দুই জোড়া। একই দিন ঢাকায় আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন, আর ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। কিন্তু গর্বে কোনো বাংলাদেশীর বুক ফুলে উঠছে কি? ভাবছি!
হিলারি কিনটন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক নম্বর প্রিয় ব্যক্তি নন। বাংলাদেশে হিলারি ও তার স্বামীর, বস্তুত আরো অনেক দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রিয়ভাজন হচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ইউনূস তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের দৌলতে বিশ্বব্যাপী মর্যাদা পেয়েছেন। অপকৌশলে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব থেকে শেখ হাসিনা তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। অনেকগুলো কারণের কথা লোকে বলাবলি করে। আগেরবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ডজনখানেক ডক্টরেট তিনি ক্রয় করেছিলেন। এবারে তার সখ হয়েছিল একটা নোবেল পুরস্কারের। নোবেল পুরস্কার কমিটি তার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেনি, বিশ্বসমাজও কমিটির সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছে। ভীষণ মর্মাহত হয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
লোকে আরো বলে, আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের বয়লারে যারা কয়লা জোগায় তাদের কেউ কেউ গ্রামীণ ব্যাংক নামক বস্তুটিকে হাতে পেতে চায়। অন্যরা বলে, গ্রামীণফোনের ওপর কারো কারো লোলুপ দৃষ্টি আছে। এ আবদার উপেক্ষা করা কি কঠিন কাজ নয়? সমস্যা হচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূস হাল ধরে থাকতে এই দ্বিমুখী আবদার রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। অতএব ইউনূসকে যেতেই হয়েছে। বিশ্ব নেতারা যথেষ্ট সহানুভূতি দিয়ে হাসিনার সমস্যাগুলো বিবেচনা করেননি। হিলারি কিনটন তো জোর প্রতিবাদই করেছিলেন। এমনকি গোসা করে বাংলাদেশে গোটা দুয়েক সফরও তিনি বাতিল করেছিলেন। সেসব হজম করে হিলারি আসছেন। মনে হচ্ছে গরজ বড় বালাই! 
প্রণব মুখার্জি প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় বিদেশী অতিথি। ভারতীয় নেতাদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সোচ্চারভাবে শেখ হাসিনাকে গদিতে বহাল রাখার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। হাসিনা এখন মহাসমস্যায় আছেন। তার সরকারের জনপ্রিয়তা এখন মাইনাসে নেমে গেছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘ইলিমিনেট’ করার ‘স্ট্র্যাটেজি’ তিনি গদি পাওয়ার প্রথম দিন থেকেই নিয়ে রেখেছিলেন। বিরোধী দলগুলোর কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে তার ক্যাডারগুলো এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্য বলে বর্ণিত গুণ্ডারা। 
তাদের মদদ দিয়েছে র‌্যাব নামে বর্ণিত বর্ণচোরা রক্ষীবাহিনী। তারা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও ‘ক্রসফায়ারের’ নামে কয়েক শ’ রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গুলি করে মেরেছে। বিশ্বব্যাপী তাদের অপকর্মের সমালোচনা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। ‘ক্রসফায়ারের’ সংখ্যা হ্রাস করার জন্য তাদের ওপর তাগিদ এসেছে। কিন্তু তারা ‘কোটা‘ পূরণ করছে ঠিকই। গত বছর দুয়েকে তারা বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী ১০০ থেকে ১২২ জন সরকারের বিরোধী ও সমালোচক নেতাকর্মীকে গুম করেছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেলেও অন্যরা এখনো নিখোঁজ আছে। এ রকমের গুম আর খুন করেছিল একাত্তরের রাজাকার আর আলবদররা। তাদের বিচারের নামে হাসিনা রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছেন। আজকের রাজাকার আর আলবদরদের বিচারও হতে হবে। 

আফগানিস্তানে বাংলাদেশী সৈন্য? 
গরজ বড় বালাই। গরজে পড়েই হিলারি ও প্রণব মুখার্জিকে একই সময়ে হাসিনার দরবারে আসতে হচ্ছে। চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকে ভারত ছিল সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রধান মিত্র। সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকা পাকিস্তানের সাথে জোট বেঁধেছিল। সোভিয়েট ইউনিয়ন আর নেই। আমেরিকার বড় ভাবনা এখন চীনকে নিয়ে। চীন এখন এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি। চীনের কাছে ঋণে আমেরিকার মাথা পর্যন্ত বন্ধক আছে। সে চীন এখন এক নম্বর সামরিক পরাশক্তি হতে চলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার প্রভাব বিস্তারে আমেরিকা আর ভারত সমানে উদ্বিগ্ন। চীনের প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকা আর ভারত এখন হাতে হাত মিলিয়েছে। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে বলয় সৃষ্টিতে তারা বাংলাদেশকেও জোটে ভেড়াতে চায়। এতে যে বাংলাদেশের সর্বনাশ হবে, তাতে তাদের কিছু আসে-যায় না।
আমেরিকার আরো গরজ আছে। নিত্য তালেবানের পিটানি খেয়ে আমেরিকা এখন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সে শূন্যস্থান পূরণের জন্য তার ভাড়াটে সৈন্য প্রয়োজন। অনেক ঠেকে পাকিস্তান এখন আর আফগানিস্তানে আমেরিকাকে মদদ দিতে রাজি নয়। অন্য দিকে শেখ হাসিনা এখন স্বাধীন প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিবর্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ভাড়াটে বাহিনী হিসেবেই ব্যবহার করতে চান। তাতে কিছু বিদেশী মুদ্রা আসে। ভারতেরও সেটাই মতলব। আসলে ভারত চায় না, বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী থাকুক। কূটনৈতিকপাড়ায় নাকি বলা-কওয়া হচ্ছে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে হিলারি হাসিনা ওয়াজেদের কাছে আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব দিতে পারেন।
গণতন্ত্রী ১৮ দলের আন্দোলনে হিলারি কিনটন কোনো রকম সমর্থন দেবেন বলে আশা করা যায় না। তবু সৌজন্যের খাতিরে ভিআইপিদের সফর উপলক্ষে ১৮ দলের নেতারা তাদের হরতাল মুলতবি রেখেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া এবং ১৮ দলের নেতাদের হুঁশিয়ার থাকতে হবে তারা যেন কোনো ভিআইপির ফাঁদে পা না দেন। মিষ্টি কথায় ভুলে তারা যদি আন্দোলন বন্ধ করতে রাজি হন, তাহলে হাসিনা হালে পানি পাবেন এবং ১৮ দলের আন্দোলনের কবর তৈরি হবে। দেশবাসী এখন হাসিনা সরকারের পতনের জন্য সম্পূর্ণ সংগঠিত। নেতারা হাসিনাকে দম নিতে দিলে জনতা সেটাকে আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলেই বিবেচনা করবে, নতুন করে তাদের সংগঠিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। 

(লন্ডন, ০১.০৫.১২) 
serajurrahman@btinternet.com

ইলিয়াসের মুক্তি পর্যন্ত হরতাল কেন চলতেই থাকবে



সি রা জু র র হ মা ন
এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যা ও গুম করার ঘটনাগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীগুলোর কোনো কোনোটি জড়িত। বিএনপি নেতা এবং ভারতের পানি আগ্রাসন, বিশেষ করে টিপাইমুখে ভারতের বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ সংগ্রামী ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া নিয়ে সরকারের সমর্থক পত্রিকাগুলোতেও যাঁরা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিচ্ছেন তাঁরাও নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। এটাও সন্দেহাতীত প্রমাণ করে যে অন্তত একটি তথাকথিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী এই গুম করার ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ সেটা বিশ্বাস করতে চান না। একটা কারণ তাঁরা আওয়ামী লীগের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বড় কারণটা এই যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যা যা ঘটেছে সেটা তাঁদের জানতে দেয়া হয়নি। ‘সঠিক ইতিহাসের’ নামে তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত ইতিহাস শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘লাল ঘোড়া দাবড়াইয়া দিব।’ প্রকৃতই লাল ঘোড়া, অর্থাত্ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থককে তখন আওয়ামী লীগের ঘাতক রক্ষীবাহিনী গুম ও হত্যা করেছিল। নিহতদের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার। রক্ষীবাহিনী সে তিন-সাড়ে তিন বছরে মোট ৪০ হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। জাসদের বর্তমান নেতা হাসানুল হক ইনুকে এককালে আমি চিনতাম ও শ্রদ্ধা করতাম। তিনি কী করে হত্যার রাজনীতির হোতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারেন ভেবে আমি সত্যি অবাক হই।
সুদূর বিদেশ থেকে অনলাইন লেখা পড়ে যতদূর বুঝতে পারি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকাটি সরকারবিরোধী নয়। এ পত্রিকায় একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের বয়ান ছাপা হয়েছে। তিনি ছিনতাইয়ের ঘটনাকালে ছিনতাইকারীদের একজনের শার্টের কলার চেপে ধরেছিলেন। সে লোকটি তার আইডি কার্ড দেখিয়ে দাবি করে যে সে একটি নিরাপত্তা বাহিনীর (র্যাবের কি?) লোক এবং তারা একটা অপারেশন চালাচ্ছে। একজন ডাব-বিক্রেতাও ঘটনাটি দেখেছিলেন। এখন তাঁরা কোথায়? ইলিয়াস আলী আওয়ামী লীগের চিহ্নিত শত্রু। বৃহত্তর সিলেটে তিনি বিএনপির সংগঠনের কাজ এতদূর এগিয়ে নিয়েছিলেন যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সেখানে আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারতেরও তিনি চক্ষুশূল। টিপাইমুখে বাঁধ তৈরির প্রতিবাদে সবচাইতে সোচ্চার প্রতিবাদ তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রমাণ নষ্ট করা ছাড়া তাঁর ড্রাইভারকেও গুম করার অন্য কী কারণ থাকতে পারে?
অথবা দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকাল। যতদূর বুঝতে পারি এ দুটি পত্রিকা সরকার ও আওয়ামী লীগের সমর্থক। উভয় পত্রিকাই খবর ছেপেছিল যে ইলিয়াস আলীকে জীবন্ত মুক্তিদানের জন্য দশটি শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল যে মুক্তি পেলে ইলিয়াস আলীকে সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঘোষণা করতে হবে যে বিএনপি নেত্রীর নির্দেশে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অন্তর্ধানের যে কারণটি নির্দেশ করেছিলেন) এবং ইলিয়াস আলীকে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবে। ইলিয়াস আলীকে কে বা কারা কী কারণে রাজনীতির ময়দান থেকে সরিয়ে দিয়েছে সে সম্বন্ধে এখনও কি কারও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে?
সাহারা ঘাতক বাহিনীকে লেলিয়ে দিচ্ছেন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন গত শনিবার ১৮ দলের জোটের দ্বিতীয় দফা হরতাল ঘোষণার পর বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা একা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়; হরতাল প্রতিহত করতে তিনি আওয়ামী লীগ কর্মীদেরও মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। গত সাড়ে তিন বছরে পুলিশ বাহিনীর কলেবর বিরাট বৃদ্ধি করা হয়েছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের বহু সদস্যকেও এ বাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতির একটা বড় যোগ্যতা। গত বছরের ৬ জুলাই সংসদ ভবনের চত্বরে বিএনপির প্রধান হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে অমানুষিক পেটানোর জন্য দায়ী মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনারকে গত কয়দিনে পদোন্নতি দিয়ে একটি জেলার পুলিশ সুপার করা হয়েছে।
তাছাড়া সরকারের র্যাব বাহিনী তো আছেই। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর পক্ষে কেন আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়? অনেক কারণ আছে তার। একটা কারণ এই যে, এই বাহিনীগুলোকে এখন গণবিরোধী ভূমিকায় নামানো হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার দলন এং গণতন্ত্র হত্যা কখনোই পুলিশের ভূমিকা হওয়া উচিত নয়। ব্রিটিশরা এবং পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরতন্ত্রও বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রস্পৃহাকে হত্যা করতে পারেনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও গত সাড়ে তিন বছরে তাদের ফ্যাসিস্ট পদ্ধতি দিয়ে দেশের মানুষের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি। পুলিশকে অনৈতিক কাজ করতে বলা হলে তারা কখনোই সে কাজে সফল হতে পারবে না।
আরেকটা কারণ এই যে র্যাব ও পুলিশকে সরকারের প্রতিপক্ষের গণতন্ত্রের আন্দোলন নির্মূল করার কাজে এতই ব্যস্ত রাখা হচ্ছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সময় তারা পায় না। দেশের সব মানুষ এখন বিশ্বাস করে যে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের খুন ও গুম করার জন্য মূলত র্যাব দায়ী। এ সরকারের সূচনা থেকেই ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবং শেখ হাসিনার সশস্ত্র ক্যাডাররা বিরোধী দলের আন্দোলন-হরতালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে এই হানাদারদের সংরক্ষণ দিতেই বেশি ব্যস্ত। ইলিয়াস আলীকে গুম করার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বনাথে প্রতিবাদ বিক্ষোভে গুলিবর্ষণে তিনজন মারা গেছে। জানা গেছে, ময়না তদন্তে দেখা গেছে যে, যে ধরনের গুলিতে তারা নিহত হয়েছে সে ধরনের অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশ পুলিশের কাছে নেই।
গৃহযুদ্ধের উস্কানি?
এ ব্যাপারটা কোনো কোনো ভারতীয় পত্রপত্রিকার খবর উল্লেখ করে শ্রীলঙ্কার একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের বিশ্বাসযোগ্যতাই তুলে ধরে। সে খবরে বলা হয়েছে যে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে ক্রুসেডার নামে পরিচিত ১০০ জন আওয়ামী লীগ ঘাতককে ভারতের দেরাদুন মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এ খবরটি দুটি কারণে বিশেষ উদ্বেগের কারণ। প্রথমত, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ও অস্ত্র সরবরাহ করে ভারত আমাদের দেশে একটা গৃহযুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ক্রুসেডের বিশেষ একটা সংশ্লেষ আছে। ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় রোমান ক্যাথলিক রাজারা জেরুসালেম দখল এবং মুসলিম আধিপত্য বিনষ্ট করার জন্য এই ক্রুসেড চালিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের যেসব কর্মীকে দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ তারা কি তাহলে বাংলাদেশে ইসলামকে ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ পেয়ে এসেছে? এখন এ সন্দেহ করার বিশেষ কারণ ঘটেছে, বিশ্বনাথে তিন ব্যক্তিকে যে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সে অস্ত্র নব্য ক্রুসেডাররা ভারতের কাছ থেকেই পেয়েছে। সাহারা খাতুন কি হরতাল ঠেকানোর নামে বিরোধী ১৮ দলের নেতাকর্মীদের রক্তপাতের নির্দেশই দিয়েছেন আওয়ামী লীগ কর্মীদের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্রুসেডারদের?
আমরা আগেও বহুবার বলেছি যে হরতাল জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু হরতাল কথাটা রাজনীতির অভিধানে ঐতিহাসিক কাল থেকেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা গোড়া থেকেই স্বীকার করেছেন, হরতাল রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম নয়, সর্বশেষ হাতিয়ার হওয়া উচিত। অর্থাত্ অন্য সব পন্থায় গণতন্ত্র রক্ষা করা না গেলে শেষ চেষ্টা হিসেবে হরতালকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত। আমরা মনে করি বাংলাদেশে এখন সে অবস্থাই এসে গেছে। একটা ফ্যাসিস্ট সরকার একটা সম্প্রসারণকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় গণতন্ত্র ধ্বংস করে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিটির পদাবনত একটা ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করতে চায়। আগেই বলেছি গণতন্ত্র বাংলাদেশের মানুষের মজ্জাগত। গণতন্ত্র রক্ষায় তাদের আত্মদানের ইতিহাস নতুন নয়। শেখ হাসিনার সরকার গত সাড়ে তিন বছরে বহু হাজার হত্যা ঘটিয়েছে। গুম করার ‘ঐতিহ্য‘ তারা স্থাপন করেছিল রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর কর্মীদের দিয়ে।
বিরোধী দলগুলো গোড়ায় সেটা নীরবে সহ্য করে গেছে। আস্কারা পেয়ে ঘাতকরা এখন অনেক ওপরে হাত বাড়াতে শুরু করেছে। ইলিয়াস আলী তার প্রমাণ। বিরোধী নেতারাও এখন শঙ্কিত। সমানেই শঙ্কিত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন বলেছেন তিনি নিজেও গুম হওয়ার ভয়ে শঙ্কিত। তারপরেও শাসক দলের জোটে অন্তর্ভুক্ত থাকতে কেন তাঁর গা-ঘিন ঘিন করে না ভাবছি।
দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ
দেশে এখন একটা ত্রাসের রাজত্ব চলছে। এ অবস্থায় কারোরই নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সেজন্যই ১৮ দলের জোটের নেতারা অবশেষে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। হরতাল সেজন্যই। তাঁরা বুঝে গেছেন এখন প্রতিরোধ করা না হলে চিরস্থায়ী ক্ষমতা তাদের হাতে চলে যাবে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দেয়ার কাজ শুরু করেছে সাড়ে তিন বছর আগে থেকেই। অর্থাত্ ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবিতে যে হরতাল ও আন্দোলন হচ্ছে সে আন্দোলন আর সে হরতাল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনও বটে। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগের হিসাব করেনি। তারা স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বর্তমানেও তাদের মনে করতে হবে যে তারা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে নেমেছে, ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব করার সময় এখন নয়।
বিএনপি দ্বিতীয় দফায় রবি ও সোমবার হরতাল ডেকেছে। বিরোধী ১৮ দলের জোট বলেছে, সোমবারের মধ্যে ইলিয়াস আলীকে মুক্তি দেয়া না হলে মঙ্গলবার মে দিবস বাদ দিয়ে আবারও হরতাল ডাকবে তারা। আগামী সপ্তাহের শনিবার ৫ মে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতের অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশে আসছেন। ১৮ দল বলেছে যে তাঁদের সফরের দিন তারা হরতাল করবে না। বিদেশি ভিআইপিদের প্রতি সৌজন্য স্বরূপ তাঁদের উপস্থিতিতে হরতাল না করা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। কূটনৈতিক মহলে বলাবলি হচ্ছে আগামী বছরে সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে চলতি বছরের মধ্যেই মতৈক্য প্রতিষ্ঠায় এই দেশদুটি খুবই আগ্রহী।
খুবই ভালো কথা। কিন্তু ১৮ দলের জোটের নেতাদের কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ২০০৭ -২০০৮ সালে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে সে ব্যাপারে এ দুটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বীণা সিক্রি ও কালা জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টম্যাস মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনেও হোতা ছিলেন মনে করা হয়। অন্যথায় শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হতেন না, বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা নিয়েও এখন প্রশ্ন দেখা দিত না। প্রণব মুখার্জি আর হিলারি ক্লিনটনের চাপে ১৮ দলের জোট যদি তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির দাবি ত্যাগ করে তাহলে মারাত্মক ভুল করা হবে। একইসঙ্গে দুই বিদেশি মন্ত্রীর চাপে পড়ে ইলিয়াস আলীর মুক্তি ছাড়া হরতালের অস্ত্র ছেড়ে দিতে রাজি হলেও নেতারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবেন। খুব সম্ভবত সে ক্ষেত্রে জনতা তাঁদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি হবে না।
(লন্ডন, ৩০.০৪.১২)

বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১২

সুরঞ্জিতের পদত্যাগ ও পুনর্বহালের পেছনে বহু প্রশ্ন

সুরঞ্জিতের পদত্যাগ ও পুনর্বহালের পেছনে বহু প্রশ্ন


॥ সিরাজুর রহমান ॥

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন আর অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্ন একমত হয়েছেন যে জ্যেষ্ঠ ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের আয় আর তারা কত কর দিয়েছেন তার বিবরণ প্রকাশ হওয়া উচিত। ক্ষমতায় আসার দু’বছরের মাথায় তাদের এই স্বচ্ছতার সিদ্ধান্তের দুটো কারণ আছে। প্রথমত, অর্থমন্ত্রী গত ২১ মার্চের বাজেটে আয়করের স্তরভেদের যেসব বিধান করেছেন সে সম্বন্ধে এখনো তুমুল বিতর্ক চলছে। দ্বিতীয়ত, আগামী ৩ মে লন্ডনের মেয়র নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরেই এটা ব্রিটেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদ বলে বিবেচিত। বড় দুটো দলের প্রার্থীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। তার জের ধরে তারা এখন নিজ নিজ ট্যাক্স রিটার্নের বিবরণ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিকদের সম্পদের ব্যাপারে কিছুকাল অগ্রবর্তী ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি বলেছিলেন, তার দল জয়ী হলে মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হবে। সবাই এখন জানে শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতিগুলো অর্থহীন, নিছক রাজনীতির কলাকৌশল মাত্র। ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো, কৃষকদের বিনামূল্যে সার দেয়া, রাতারাতি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করে ফেলা ইত্যাদি আরো বহু প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন গদি পাওয়ার আশায়। গদি তিনি পেয়েছেন, কিন্তু কোন প্রতিশ্রুতিটি তিনি পালন করেছেন?
গদি লাভের তিন বছর পর শেখ হাসিনা মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাবের কথা উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু সে হিসাব প্রকাশের কথা তিনি আর বলেননি, শুধু বলেছেন মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব তার কাছে জমা দিতে হবে। ২০০৮ সালের প্রতিশ্রুতি আর ২০১১ সালের নির্দেশের মধ্যে এই আকাশ-পাতাল গরমিল কেন? এ সরকারের আমলে দেশজোড়া দুর্নীতি ১৯৭২-৭৫ সালের মহাদুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভর্তিবাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্য, নিয়োগবাণিজ্যÑ এগুলো কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। দুর্নীতি প্রমাণ করা কখনোই সহজ নয়। যারা দুর্নীতি করে তারা এত বোকা নয় যে সাক্ষী-প্রমাণ রেখে দুর্নীতি করবে। কিন্তু দেশের সব মানুষের উপলব্ধি এই যে দিনদুপুরে পুকুর চুরিই নয়, রীতিমতো দীঘি চুরি; এমনকি বঙ্গোপসাগর চুরিই চলছে এখন। নির্বাচন যখন হবে ভোটদাতারা তখন প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করবে না, উপলব্ধি থেকে তারা ভোট দেবে; উপলব্ধিই তাদের প্রার্থী এবং দল নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট হবে। 

ভেবে দেখুন! এ সরকার ক্ষমতা পাওয়ার পর লে. ক. ফারুক খান যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন চাল-ডাল-তেল-নুন-আটা থেকে শুরু করে পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কার দামেও যে ফটকাবাজি চলেছে, সেসব কথা বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যেতে পারবে? তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে যেসব সিন্ডিকেট আর গ্রুপকে ২০ হাজার কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট বিনা টেন্ডারে দেয়া হয়েছে এবং চুরির দায়দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়ার আগাম মুচলেকা দেয়া হয়েছে, তাদেরও কোনো কোনোটির মালিক সরকারের উচ্চপদে আসীনদের আত্মীয়স্বজন অথবা দলের ভেতর ক্ষমতার খুঁটি বলে বিবেচিত কয়েকজন।

আরো দেখুন! দেশের ৩২-৩৩ লাখ স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যেকোনো প্রকারেই হোক কিছু টাকা সংগ্রহ করে সুদিনের মুখ দেখার আশায় শেয়ারবাজারে লগ্নি করেছিল। সেসব টাকা কুমিরে খেয়েছে। তারা এখন পথে বসেছে, তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেছে। সরকারের ভেতরের কিছু লোক এবং সরকারের দেশী-বিদেশী পৃষ্ঠপোষকেরা এই ৩২-৩৩ লাখ লোকের যথাসর্বস্ব লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে বলেই সবার বিশ্বাস। সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটা জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটি নাম ধরে দুর্বৃত্তদের তালিকাও সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, এমনকি তস্করদের নামের তালিকা প্রকাশ করতেও তারা সাহস পায়নি। 

দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের এই অনীহা থেকে দেশের মানুষ ঠিকই বুঝে গেছে এ সরকার তাদের কল্যাণ সাধনের জন্য নয়, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতেই গদিতে এসেছে। আর হাসিনা কেন মন্ত্রীদের সম্পদের তালিকা চেয়েছেন? তারও কারণ আছে। সরকার এখন চতুর্থ বছরে পড়েছে। মন্ত্রীদের চাকরির মেয়াদ আর মাত্র দেড় বছর। আখের গুছিয়ে নিতে তাদের আর ধৈর্য সয় না। লুটপাটের ব্যাপারে তাদের কেউ কেউ বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে উচ্ছৃখলতা আর অবাধ্যতার ভাবও দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। মন্ত্রীদের দুর্নীতি আর টাকার পাহাড়ের খোঁজখবর হাতে থাকলে রাশ টেনে ধরতেও সেই হিসাবকে ব্যবহার করা যাবে।

মন্ত্রীদের পেট এখন অনেকটা ভরে এসেছে। এ দিকে নির্বাচনের সময়ও এগিয়ে আসছে দ্রুত। সংসদ সদস্যদের পেটও এখন ভরানো দরকার। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছাড়া আগামী নির্বাচনে ভোট পাওয়ার উপায় নেই। যেকোনো প্রকারেই হোক তাদের খুশি করা না গেলে তারা বহু হাঁড়ি হাটেই ভেঙে দেবেন, শেষমুহূর্তে হয়তো ভাঙা নৌকা থেকে লাফিয়ে অন্য দলে চলে যাবেন কেউ কেউ, যেমন করে ডুবন্ত জাহাজ কিংবা নৌকা থেকে ইঁদুর-ছুঁচো লাফিয়ে পড়ে। তাদের বেশ কয়েকজনকে এখন ব্যাংক করার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক করার পুঁজি তারা কোথায় পেলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান কি একবারও তার খোঁজ নিয়েছেন? জোর গুজব, ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার ব্যাপারে দেদার টাকার হাতবদল হয়েছে। রেডিও, টেলিভিশন, টেলিকম লাইসেন্সের ব্যাপারেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। শোনা যাচ্ছে নতুন নতুন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি খোলার জন্যও লাইসেন্স দেয়া হবে। সন্দেহ নেই যে সরকারের ভেতর মহলের কেউ কেউ আরো বহু কোটি টাকা হাতিয়ে নেবেন সেই সুবাদে।

দুর্নীতি তদন্তে সরকারের অনীহা
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বহু অভিযোগ মিডিয়ায়ও প্রচার হয়েছিল। এমনকি পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির প্রমাণও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তখনো আমরা বলেছিলাম, সৈয়দ আবুল হোসেনকে বরখাস্ত করার সাহস সরকারের হবে না। আসলেও হয়নি। একাধিক কারণ আছে তার। দেশে ব্যাপক সন্দেহ আছে, যেকোনো কারণেই হোক ‘ওপরের’ শক্তিশালী সমর্থন আছে আবুল হোসেনের পেছনে। প্রচার-প্রচারণায় কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার পর তাকে অন্য এমন একটি দফতরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি বৈ কম নয়। বিশ্বব্যাংক এখন কানাডার একটি নির্মাণ কোম্পানিকে দুর্নীতির দায়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজে অযোগ্য ঘোষণা করেছে। 
অনেক প্রবাদ আছে চোর ও চুরি সম্বন্ধে। একটা হচ্ছেÑ চোরেরও ধর্ম আছে। আরেকটা চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। আসল কথা হচ্ছে, এক চোর অন্য চোরকে ধরিয়ে দেয় না। এবং আগেই বলেছি চোরেরা সাক্ষী-প্রমাণ রেখে চুরি করতে চায় না। আরেকটা প্রবাদÑ চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দুর্ভাগ্য। তিনি ধরা পড়ে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বলেই সবার ধারণা। 
অত্যন্ত নাটকীয় কিছু ঘটনা ঘটেছে ৯ এপ্রিল দিবাগত শেষ রাতে। চলমান একখানি গাড়ি হঠাৎ করে মোড় নিয়ে পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বাহিনীর সদর দফতরে ঢুকে পড়ে। সেই গাড়ির আরোহীরা ছিলেন গাড়ির মালিক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ওমর ফারুক তালুকদার, বাংলাদেশ রেলের পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধা আর রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডেন্ট এনামুল হক। গাড়ির চালক ছিলেন আজম খান। পিলখানায় ঢুকেই আজম খান নাকি চিৎকার করে বলতে থাকেন গাড়িতে অনেক টাকা আছে। বিজিবির লোকেরা তল্লাশি করে নাকি ৭০ লাখ টাকা পান। এত রাতে তারা কোথায় যাচ্ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাবে ড্রাইভার ও যাত্রীরা সবাই বিজিবিকে বলেন যে তারা রেলমন্ত্রীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পরদিন মিডিয়াকেও তারা একই কথা বলেন। কিন্তু রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পরে দাবি করেন ওই তিনজন যাত্রী আজম খান চালিত গাড়িতে তার বাড়িতে যাচ্ছিলেন না, যাচ্ছিলেন তার একান্ত সচিব ওমর ফারুক তালুকদারের বাড়িতে।

সঠিক চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি
অনেক কারণে সেই রাতের ঘটনাবলির একটা স্বচ্ছ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধা বলেছিলেন, একটা স্টেশনে (শায়েস্তাগঞ্জ?) ট্রেন থামবে কি না আলোচনার জন্য তিনি রেলমন্ত্রীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। তাহলে গাড়িতে যে বস্তা বস্তা টাকা ছিল তার ব্যাখ্যা কী? একটা কথা তখনো শোনা গিয়েছিল গাড়িতে ৭০ লাখ নয়, চার কোটি ৭০ লাখ টাকা ছিল। অবশিষ্ট চার কোটি টাকা তাহলে গেল কোথায়? চার কোটি ৭০ লাখ অঙ্কটার কিছু প্রাসঙ্গিকতা আছে। মোটামুটি একই সময়ে খবর পাওয়া যায়, সুরঞ্জিতের পুত্র সৌমেন পাঁচ কোটি টাকায় একটা টেলিকম লাইসেন্স কিনেছেন। তার টাকার উৎসই বা কী? আরেকটা প্রশ্ন : ড্রাইভার আজম খান কি টাকার বখরার কারণে পিলখানায় ঢুকে পড়েছিলেন, নাকি দুর্নীতি দমনের নাগরিক দায়িত্ব থেকে যাত্রীদের তিনি বিজিবির হাতে ধরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? শোনা যাচ্ছে আজম খানকে এখন পাওয়া যাচ্ছে না, তার পরিবার তার নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন। কোথায়, কেমন আছেন আজম খান?
গা বাঁচানোর জন্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চেষ্টাগুলো প্যাথেটিক। মূল অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। নিজেকে নির্দোষ সাব্যস্ত করতে তিনি দুটো ‘এক ব্যক্তির’ তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন তারই অধীনস্থ দু’জন কর্মকর্তার অধীনে। এপিএস ফারুক সম্বন্ধে তদন্তের ভার দেয়া হয়েছিল তারই সহকর্মী পিএস (একান্ত সচিব) আখতারুজ্জামানকে। আর জেনারেল ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় রেল মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব শশী কুমার সিংকে, যিনি মোটামুটি জেনারেল ম্যানেজারের সমমর্যাদার কর্মকর্তা। বর্তমান সরকারের আমলে ‘তদন্ত’ ব্যাপারটাই মূল্যহীন। কোনো তদন্তেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয় না। 

সাংবাদিক দম্পতি মেহেরুন রুনি আর তার স্বামী সাগরের হত্যার তদন্ত তদারকির ভার নিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সেই হত্যারও কোনো সুরাহা হয়নি। শোনা গিয়েছিল বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কন্ট্রাক্টে ব্যাপক দুর্নীতি সম্বন্ধে তারা তদন্ত করছিলেন। আরো শোনা গিয়েছিল যে খুনিদের তাড়াতাড়ি আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের সাড়ে তিন বছরে দুর্নীতি দমন কমিশন শাসক দলের কাউকে দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি। এ সরকারের আমলে তদন্তের অন্য অর্থ হচ্ছে সময়ক্ষেপণ এবং সত্য উদঘাটন না হওয়া।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করতে অস্বীকার করছিলেন। রাতের বেলায় প্রধানমন্ত্রী তাকে তলব করার পরের দিন সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় এই প্রথমবার একজন মন্ত্রী বরখাস্ত হলেন। শেখ হাসিনার অনুগত রাজনীতিক ও লেখকেরা চমৎকৃত হয়েছেন তাতে। সরকারের গৃহপালিত মিডিয়া এই পদত্যাগকে পুঁজি করে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ ঘষামাজা করার কাজে লেগে গেছে। এখানে প্রধানমন্ত্রীর নবজাগ্রত কোনো শুভবুদ্ধির পরিচয় আমি দেখতে পাই না। প্রকৃত ব্যাপার এই, সরকারের মধ্যে দুর্নীতির একটা সিন্ডিকেট আছে। ধারণা করা হয়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ধরা পড়ে গিয়ে গোটা সিন্ডিকেটকেই বিপদগ্রস্ত করেছেন। 
গত সাড়ে তিন বছরে রেলওয়ে বিভাগে সাড়ে সাত হাজার জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। রেল কর্মচারী, ইউনিয়ন সদস্য ও নেতা এবং চাকরিপ্রার্থীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, প্রতিটি নিয়োগের বেলায় নিয়োগকর্তারা দুই থেকে চার লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এই নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগ তারা কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। কেন হয়নি এখন আর কারো বুঝতে বাকি রইল না। 

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম
মিডিয়ায় এবং অন্যত্র তার পদত্যাগের দাবিকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন। সুরঞ্জিত বাবু বিরোধী দলের বিরুদ্ধে গা ঘিনঘিন করা দাঁত খিঁচানো ব্যঙ্গ দিয়ে এতকাল শুধু নিজেকেই আমোদিত করছিলেন। তার এই দাবিতে বহু মহলেই বিদ্রƒপের হাসি দেখা দেবে। এ সরকারের কাজে এবং কর্মে সুরঞ্জিত বাবু গণতন্ত্র কোথায় দেখলেন? কোন গণতন্ত্রের কথা বলছেন তিনি? ক্ষমতা পাওয়ার প্রথম দিন থেকে এ সরকার গদি চিরস্থায়ী করার জন্য ফ্যাসিস্ট পন্থায় সব রাজনৈতিক বিরোধিতাকে নির্মূল করার পরিকল্পিত অভিযান শুরু করেছে। 
হত্যা, ধরপাকড় এখনো অব্যাহত গতিতে চলছে। জেলখানায় এদের স্থান করার জন্য ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের মুক্তি দিচ্ছে সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যার সাথে ইদানীং যুক্ত হয়েছে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুম করে ফেলা। ঢাকার কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে দিয়ে এই গুম করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সর্বশেষ গুম হয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য, সিলেট জেলা বিএনপির প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। দেশব্যাপী জোর গুজব এবং বিএনপি সরাসরি অভিযোগ করেছে যে সরকারই বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে।
বিরোধী দলকে সভা-সমিতি ও মিছিল করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। গত ১২ মার্চ বিএনপির আহূত ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি বানচাল করতে সরকার যা করেছে সেটা রীতিমতো ন্যক্কারজনক। প্রধান বিরোধী দলের সদর দফতরকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখার দৃষ্টান্ত সম্ভবত নাৎসিরাও দেখাতে পারেনি। প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। এই তিনটি বিভাগকে বিরোধী দলের নির্যাতনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ সরকারের আমলে যে ক’টি মেয়র নির্বাচন হয়েছে প্রতিটিতে সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। রাজধানীতে পরাজয়ের গ্লানি এড়ানোর জন্য এখানের মেয়র নির্বাচন সরকার তিন বছর ঠেকিয়ে রেখেছিল। রাজধানীকে দুই টুকরো করে নির্বাচন আবারো পেছানো হয়েছে। তার পরও নির্বাচন কমিশন বিভক্ত ঢাকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল। আসন্ন নির্বাচন আরো তিন মাসের জন্য মুলতবি করেছেন আদালত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কটূক্তি করে বিরোধী দলের সংসদে উপস্থিতি অসম্ভব করে তুলেছেন। সুরঞ্জিত স্বয়ং যে ভাষায় বিরোধী দলকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছেন সেটাকেও গণতন্ত্রের ভাষা বলা যায় না। এই যদি গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হয় তাহলে সেই গণতন্ত্র কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষের কাম্য হতে পারে না। 

ভারতের চাপে সুরঞ্জিত আবার মন্ত্রী
পদত্যাগ করেও মাত্র ৩০ ঘণ্টা পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবার ক্যাবিনেটে স্থান পেয়েছেন দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে। তার পদত্যাগে সরকারের ইমেজ বেড়েছে বলে যেসব পত্রিকা নাচানাচি করছিল তারা এখন কী ব্যাখ্যা দেবে? বরং এটাই মনে হয় যে এ সরকার আপন স্বার্থে আপনজনদের ক্ষমতা-বলয়ের বাইরে যেতে দেবে না। তাহলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কি ইতোমধ্যেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন? সত্যি সত্যি যদি তিনি নির্দোষ হন তাহলে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন কেন?
আসল ব্যাপার সেটা নয়। দেশব্যাপী জোর গুজব সুরঞ্জিতকে আবার মন্ত্রী করা হয়েছে ভারতের চাপে। আমরা আগেও অনেকবার লিখেছি, এ সরকারের আমলে বাংলাদেশে কী ঘটবে না ঘটবে সেটা স্থির হয় দিল্লিতে। আমরা বলেছি এবং বিশ্বব্যাপী আরো অনেকে বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিক তিন লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। বর্তমান সরকার গায়ের জোরে প্রমাণ করতে চায় যে তিন মিলিয়ন, অর্থাৎ ৩০ লাখ নিহত হয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে। সঠিক সংখ্যা যা-ই হোক সে যুদ্ধে অজস্র প্রাণহানি হয়েছে। ভারতের অঙ্গুলি তাড়নে পরিচালিত হওয়ার জন্যই কি মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছিলেন? 
বাংলাদেশের মানুষ জানে বিনা মেঘে বজ্রপাত কিংবা বিনা আগুনে ধোঁয়া হয় না। তারা এই সরকারকে দুর্নীতিবাজ বলে ভাবতে শিখেছে। তারা ধরে নিয়েছিল যে সুরঞ্জিতের পদত্যাগের ফলে অন্তত একটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেল। তাদের বিভ্রান্ত করার জন্যও শ্রী সেনগুপ্তকে আবার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এত 
বোকা নয়। এত সহজে তাদের সাথে প্রতারণা করা যাবে না। 
(লন্ডন, ১৮.০৪.১২) 
serajurrahman@btinternet.com

মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১২

জার্মান সমরবাদের ভূত এখন ইসরাইলের কাঁধে : গুন্টার গ্রাস


সি রা জু র র হ মা ন


গুন্টার গ্রাস কৈশোরে জার্মানির আর-আর কিশোরদের মতোই হিটলারের কুখ্যাত এসএস বাহিনীর যুব শাখায় যোগ দিয়েছিলেন। নািসবাদের স্বরূপ এবং তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ভেতর থেকে দেখার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে তাঁর কবিতা ও রচনায় সে ফ্যাসিবাদের প্রতি ঘৃণা মূর্ত হয়ে উঠেছে। সেজন্যই তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ‘জার্মানির বিবেক’ বলে বর্ণিত।
হিটলার ইউরোপের ওপর এবং তার জের ধরে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন তাতে ১০ কোটি লোক মারা গেছে বলে অনুমান করা হয়। জায়নিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তখন থেকেই দাবি করে আসছে যে, নািসরা ছয় মিলিয়ন (৬০ লাখ) ইহুদিকে হত্যা করেছিল। তখন থেকে বিশ্বে আধিপত্যবাদী জায়নিস্টরা তাদের ৬০ লাখ নিয়ে এমনই প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে যে, সেই যুদ্ধে নিহত অবশিষ্ট প্রায় সাড়ে নয় কোটির কথা বিশ্ববাসী ভুলেই গেছে বলা চলে।
ইহুদিদের হিটলারের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’ পাঠানোর ব্যাপারে ফ্রান্সসহ কোনো কোনো দেশ নািসদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলো। ব্রিটেনসহ অন্য দেশগুলো নািসবাদের বিবর্তন ও ইহুদি নির্যাতন দেখেও দেখেনি। বস্তুত জার্মানি যখন চেকস্লোভাকিয়া আক্রমণ করে তার আগে পর্যন্ত ব্রিটেনও হিটলারকে তোষণ করেছে। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের আগে ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।
যুদ্ধের পর থেকেই বিশ্ব আধিপত্যবাদী জায়নিস্টরা হিটলারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য ইউরোপের দেশগুলোর কাছ থেকে খুবই উচ্চমূল্য আদায় করতে শুরু করে। গোড়াতেই সব ব্যাপারে ইহুদিদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এ মহাদেশে যেন রাষ্ট্রধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। ইহুদি-বিদ্বেষকে দণ্ডনীয় অপরাধ করা হয় প্রায় সব ইউরোপীয় দেশে। ইউরোপ-আমেরিকার বাধ্যতামূলক সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ইহুদিরা ফিলিস্তিনি আরবদের (মুসলিম ও খ্রিস্টান) ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য যে পরিমাণ ভূমি নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো, আজকের ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তন তার প্রায় তিনগুণ। প্রথমেই ইরগুন, স্টার্ন গ্যাং প্রভৃতি মূলত পোলিশ ইহুদি সন্ত্রাসীরা প্রায় আট হাজার বর্ধিত আরব পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের ভিটেবাড়ি ও আবাদি জমি দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের অবশিষ্টাংশও দখল করে। জাতিসংঘ তখন থেকে এই দখল করা আরব ভূমি ছেড়ে যাওয়ার জন্য ইসরাইলকে নির্দেশ দিয়ে বহু প্রস্তাব পাস করেছে, কিন্তু আরবদের ভিটেবাড়ি, আবাদি জমি ও ফলের বাগান উচ্ছেদ করে ইহুদি বসতি নির্মাণ অবিরাম চলছে। জাতিসংঘ অনেক প্রস্তাব পাস করে এসব বসতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
এসব প্রস্তাব কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না এ কারণে যে, ইসরাইলকে বাধ্য করার কোনো প্রস্তাবে সম্মতি দিতে ইউরোপের দেশগুলোকে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানো যাচ্ছে না। জায়নিস্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ইহুদিরা এসব দেশে সব গুরুত্বপূর্ণ পেশায় ঢুকে পড়েছে। ইউরোপের কোনো দেশে ইহুদিদের সংখ্যা তিন-চার শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু সেসব দেশের পার্লামেন্টে এবং সরকারে ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব আনুপাতিকভাবে বেশি। তেমনি এই দেশগুলোর অর্থনীতি এবং মিডিয়াকেও তারা মুঠোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি প্রভাব আরও প্রকট। ইহুদি ও ইসরাইলি লবিগুলোর অনুমোদন ছাড়া এখন মার্কিন কংগ্রেসে কোনো আইন পাস করা অথবা কোনো রাজনীতিকের কোনো গুরুত্বত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো কথা উঠলেই সারাবিশ্বের ইহুদিরা ‘অ্যান্টিসেমিটিজমের’ (ইহুদি-বিদ্বেষের) জিগির শুরু করে দেয়, নািসদের হাতে নিহত ৬০ লাখ ইহুদির কথা তুলে কান্না জুড়ে দেয়। অর্থাত্ ত্রিশের দশকে নািসদের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার দরুন জায়নিস্টরা এখনও পশ্চিমা বিশ্বকে জিম্মি করে রেখেছে, বাকি বিশ্বকেও ব্ল্যাকমেইল করে।
পশ্চিমা সাহায্যে ক্ষুদে হিটলার
ইহুদি-বিদ্বেষ নিষিদ্ধ করার পেছনে আদি যুক্তি ছিল নািসবাদের পুনরাবির্ভাব অসম্ভব করে তোলা। জার্মান ‘মিলিটারিজমের‘ (সামরিক মনোভাবের প্রাবল্য) কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দখলদার শক্তিগুলো (ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও ফ্রান্স) এ জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বহু নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালু করে। কিন্তু অন্যদিকে ‘শত্রু-পরিবেষ্টিত ইসরাইলের আত্মরক্ষার ‘অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক সাহায্য দান এবং সমরাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সাহায্যে ইসরাইল গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে। তার অস্ত্রভাণ্ডারে এখন ৪০০টি পারমাণবিক বোমা আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কবি গুন্টার গ্রাস এখন ফাঁস করে দিলেন যে, জার্মানিও ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে এবং বর্তমানে ইসরাইলের জন্য দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করছে।
অবিসংবাদিত সত্য এই যে, ইসরাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান সামরিক শক্তি। নিজেরও অত্যন্ত আধুনিক একটা যুদ্ধাস্ত্র তৈরির শিল্প সে গড়ে তুলেছে। ভারতসহ কোনো কোনো দেশ ইসরাইলের কাছ থেকে সমরাস্ত্র আমদানি করে। বস্তুত ভারতেও ইসরাইলের সহযোগিতায় একটা অস্ত্র নির্মাণশিল্প গড়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক পরাশক্তির অবস্থান স্থায়ী করতে তেলআবিব সর্বদা উদগ্রীব। এ অঞ্চলের অন্য কোন দেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠার চেষ্টা করলে ইসরাইল স্বয়ং কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সে দেশকে শক্তিহীন করে দেয়া তেলআবিবের পরিচিত কৌশল। ইসরাইল গোড়া থেকেই দাবি করে এসেছে, যে কেউ তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বিবেচনা করলে আগেই তাকে আক্রমণ করার অধিকার ইসরাইলের আছে। অর্থাত্ এক্ষেত্রে সে অভিযোগকারী, জজ ও জুরির ভূমিকা একাই পালন করছে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র তারপর অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি নীরবে তেলআবিবের সে অন্যায় আবদার মেনে নিয়েছে।
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সম্ভাবনা দেখা দেয় নতুন আদর্শে উজ্জীবিত ইরান ইসরাইলি আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনা ও অস্ত্র সাহায্যে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধ আট বছর ধরে চলে। কিন্তু সে সাদ্দামই যখন বাগদাদের উপকণ্ঠে অসিরাকে একটা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেন তখন ১৯৮১ সালে ইসরাইল ভোল-পাল্টানো মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহার করে কেন্দ্রটি উড়িয়ে দেয়।
আট বছরের যুদ্ধের পর ইরান সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ইরাক শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। তখন থেকে ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদ প্রচার চালাতে থাকে, সাদ্দাম হোসেন গোপনে গণবিধ্বংসী (পারমাণবিক ও রাসায়নিক) অস্ত্র তৈরি করছেন। গোড়ায় ওয়াশিংটন কিংবা লন্ডন এসব প্রচারণায় বিশেষ কান দেয়নি। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (নাইন-ইলেভেন) নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে আল কায়েদা সন্ত্রাসের পর মার্কিন জনমত ভয়ঙ্কর রকম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে দাঁড়ায়। সে বছরের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ইসরাইল সাদ্দামের কল্পিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের স্তূপের প্রচারণা বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে মোসাদ এ মর্মে ভুয়া প্রমাণ দাঁড় করায় যে, সাদ্দাম হোসেন আল কায়েদাকে সাহায্য দিচ্ছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ার ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
ইরান ওদের লক্ষ্য কেন?
সাদ্দাম ও তার ছেলেদের হত্যা করা হয়েছে। ইরাক দেশটির ধ্বংস এতো ব্যাপক ও সাংঘাতিক হয়েছে যে, আগামী ৫০ বছরে এ দেশটির আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পাশের দেশ ইরানের বৈশিষ্ট্য তার উদ্ভাবনী প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রম। ইসরাইলি উস্কানিতে ইউরোপ-আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ সত্ত্বেও দেশটি আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, বিজ্ঞানে-প্রকৌশলে অনেক উন্নতি করেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে তার অগ্রগতিকে বন্ধুরা প্রশংসার আর শত্রুরা শঙ্কার চোখে দেখছে।
মার্কিন বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, ইরান এখনও পর্যন্ত ইউরেনিয়াম জ্বালানি সমৃদ্ধিকরণের কাজেই অগ্রগতি লাভ করেছে কিন্তু বোমা তৈরির কোনো চেষ্টা সে এখনও করেনি। ইরানের নেতারা বার বার বলছেন—তারা বোমা তৈরি করতে চান না; শুধু পারমাণবিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের উন্নত জ্বালানি তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। ইরানের জন্য সমস্যা এই যে, সর্বোচ্চ গ্রেডের ইউরেনিয়াম দিয়ে যেমন সফলভাবে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যায়, তেমনি সে ইউরেনিয়াম আবার বোমা তৈরির কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে—যদি সে প্রযুক্তি ইরান আয়ত্ত করতে পারে।
ইসরাইলি গোয়েন্দারা এটা প্রমাণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে যে, বোমা তৈরির প্রযুক্তি ইরান এরই মধ্যে আয়ত্ত করে ফেলেছে এবং আগামী ক’মাসের মধ্যেই তেহরান পারমাণবিক বোমার অধিকারী হবে। মার্কিন সরকারের মূল্যায়ন কিন্তু তেমন নয়। ইচ্ছা করলেও ইরান এত শিগগির বোমা তৈরি করতে পারবে বলে তারা মনে করে না। তা সত্ত্বেও তেলআবিব বোমা ফেলে ইরানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পীড়াপীড়ি, এমনকি ব্ল্যাকমেইল করারও চেষ্টা করছে। ইসরাইলিরা বলছে, ওয়াশিংটন কিছু না করলে তারা নিজেরাই কেন্দ্রগুলোর ওপর আক্রমণ চালাবে। তেমন অবস্থায় ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক, ওয়াশিংটনও সে যুদ্ধে না জড়িয়ে পারবে না। মোসাদের লোকেরা এরই মধ্যে ইরানের একাধিক স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এ পর্যন্ত তারা চার ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে খুনও করিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ওবামার হয়েছে মহাসমস্যা। যদিও তিনি মনে করেন না ইরানের বোমা তৈরির সময় আসন্ন, তবুও ইসরাইলের চাপ এড়িয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন। আর ৭ মাস পরই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওবামা আরও চার বছরের জন্য ক্ষমতা পেতে চান। ইসরাইলি লবিগুলোকে অসন্তুষ্ট করে নির্বাচিত হওয়া তার জন্য সহজ হবে না। অন্যদিকে ইরাক আর আফগানিস্তানে যুগপত্ যুদ্ধে মার্কিন অর্থনীতি কাবু হয়ে পড়েছে। এ দুটি দেশে ওয়াশিংটন যতদিন জড়িত, সেটা দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধের মোট মেয়াদের চেয়েও বেশি। মার্কিন ভোটদাতারা এখন যুদ্ধক্লান্ত।
সমরবাদের কথা পশ্চিমারা ভুলে গেছে
আগেই বলেছি, জার্মানিতে অ্যান্টিসেমিটিজম নির্মূল করতে গিয়ে আমেরিকা আর ইউরোপ জার্মান মিলিটারিজমের অভিশাপের কথা ভুলে গেছে। গুন্টার গ্রাস সম্প্রতি একটি জার্মান সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘যে কথা বলতেই হবে’ শীর্ষক কবিতায় সে কথাটা আবার বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন—‘যে যুদ্ধবাজ জার্মানিকে দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে লিপ্ত করেছে, সে ভূত এখন ইসরাইলের ঘাড়ে চেপেছে।’ নাম না করে তিনি বলেছেন, ইরান এখনও পারমাণবিক বোমা তৈরি করেনি, তবুুও তার ‘প্রথম আক্রমণের’ অধিকারের জোরে ইসরাইল ইরান আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে; অথচ ইসরাইল নিজেই গোপনে তৈরি করেছে সে বোমা।
গুন্টার গ্রাস ‘যে কথা বলতেই হবে’ কবিতায় লিখেছেন : ‘এতকাল কেন আমি নীরব আর আটকা পড়ে ছিলাম/এমন একটি বিষয়ে যেটা প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায়/আমরা যারা বেঁচে থাকব সে যুদ্ধের পরে/বড়জোর পাদটীকা হয়েই থাকব আমরা।’
‘প্রথমেই আক্রমণের কথিত অধিকার/ধ্বংস করে দিতে পারে ইরানি জাতিকে/যারা কে গলাবাজ আর সাজানো জলসার পদানত/কেননা তার অধীনে নাকি অ্যাটম বোমা তৈরির কাজ চলছে।’
‘তবু অন্য সে দেশটির নাম নিতে কেন আমার ভরসা হচ্ছে না/বহু বছর ধরে যারা অ্যাটম বোমা গোপন রেখেছে ও বাড়াচ্ছে/আর সবার নজরদারি আর তদারকির বাইরে।’ লিখেছেন গুন্টার গ্রাস।
যে ইহুদিরা একদা নির্যাতিত ছিল, তারা এখন নির্যাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইঙ্গিতে গুন্টার গ্রাস বলতে চেয়েছেন, জার্মান সমরবাদ প্রথমে ইউরোপে এবং তার জের ধরে বাকি বিশ্বে সর্বনাশ ডেকে এনেছিল, ইসরাইলি সমরবাদও তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ডেকে আনতে চায় এবং সে অশান্তি খুব সম্ভবত বৃহত্তর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
গুন্টার গ্রাস এতকাল ইসরাইলসহ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ছিলেন। বহুবার তিনি ইসরাইল সফরও করেছেন। কিন্তু ইসরাইলি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দিয়েছেন—তাকে আর ইসরাইলে আসতে দেয়া হবে না। বিশ্বব্যাপী ইসরাইলি লবিগুলো তার সমালোচনার প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে বলেই মনে হয়। এতকাল যিনি ‘হিরো’ ছিলেন, মাত্র একটি কবিতা লিখে তিনি জায়নিস্ট জগতে ‘ভিলেন’ হয়ে গেলেন।
কালো মেঘের রুপালি বর্ণচ্ছটার মতো একটা আশার আলো আছে জার্মান চিন্তানায়ক গুন্টার গ্রাসের এই সাময়িক বিপত্তির মধ্যে। ইসরাইল যে সত্যি সত্যি বিশ্বশান্তির প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে কথা এখন অনেকেই ভাবতে শুরু করবেন। গুন্টারের সাহিত্য অনেকেই পড়েননি কিন্তু তার এই বহু আলোচিত কবিতাটি বহু দেশে, বহু ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। (লন্ডন, পহেলা বৈশাখ, ১৪১৯)

serajurrahman@btinternet.com

প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা বাংলাদেশের জন্য নয়



২০১২-০৪-১৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দয়ার শরীর। তার দয়াদাক্ষিণ্য আর বদান্যতার তুলনা নেই। সমস্যা হচ্ছে সব বদান্যতাই তিনি রিজার্ভ রেখেছেন পাশের দেশের জন্য। নিজের দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তার যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।
বাংলাদেশ ধুঁকছে। মধ্যবিত্ত স্বভাবতই সুজন। উপোস থাকলেও ভিক্ষা করা তার ধাতে সইবে না। সস্তা বলে বাজারের সবচেয়ে খারাপ জিনিস কিনবে সে। যৎসামান্য সঞ্চয় অনেক আগেই বিক্রি করে খেয়েছে। সাততাড়াতাড়ি সমৃদ্ধির মুখ দেখার আশায় গ্রামের বাড়ির জমি এবং গিন্নির বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া গয়নাগাঁটি বিক্রি করে শেয়ারবাজারে লগ্নি করেছিল। সরকারি দলের তস্কররা সেটা লুটেপুটে খেয়েছে। ছেলেপুলে ছেঁড়া কাপড় পরে স্কুলে যায়। যাদের চাকরি আছে, তারা সম্বল মাত্র একজোড়া ট্রাউজার ধুয়ে বালিশের নিচে ভাঁজ করে রাখে। সকালবেলা সেটি পরে আপিসে যাবে।
কেউ কেউ এখনো ঘুষ-উৎকোচ আর দুর্নীতির পথে যাননি। সব মানুষই স্বভাবত দুর্নীতিপরায়ণ নয়। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে কেউ কেউ দুর্নীতির পথ ধরেছেন। ইংরেজি প্রবাদ অনুযায়ী ‘দুর্নীতিপরায়ণ সমাজ নৈতিক দেউলিয়া।’ ছেলেপুলের শুকনো মুখ দেখে কেউ কেউ নীতি-নৈতিকতার কাছ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন' তারাও ভালো নেই। অস্বাভাবিক ভ্যাপসা গরমে রাতে ঘুমুতে পারেন না। সিলিংয়ের পাখাটা চালাবেন কী করে? বিদ্যুতের লোডশেডিং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১৬ ঘণ্টা। শিশুদের স্কুলের পড়া পড়তে হয় টিমটিমে মোমবাতির আলোতে। এ অবস'া চলতে থাকলে তাদের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দেবে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একবার নয়, বহুবার বলেছেন যে, অর্থনীতি সঙ্কটে আছে। আরো বলেছেন, ব্যাপক দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন ও অর্থনীতির বিকাশ হতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন অন্য কথা। তিনি বলেন, অর্থনীতির কোনো সমস্যা নেই, অর্থনীতি ভালো অবস'ায় আছে। তাদের মধ্যে কে সত্য কথা বলছেন? কার কথা লোকে বিশ্বাস করবে?
মাঝে মাঝে কলে পানি থাকে না। অন্য সময়ে পাওয়া যায় দুর্গন্ধময় দূষিত পানি। বহু পরিবারে সবাই পেটের অসুখে ভুগছে। যারা মারা যাচ্ছে তাদের মধ্যে শিশুরাই বেশি। পানি ফুটিয়ে খাবে, তারও উপায় নেই। চুলায় গ্যাস নেই। গিন্নিকে শেষ রাতে উঠে সামান্য কিছু রান্না করে রাখতে হয়। ও সময়ে গ্যাস আসে। সেচের অভাবে ফসল কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্যের দাম তাতে বেড়ে যাবে। দুর্ভিক্ষ ঘটারও আশঙ্কা বাদ দেয়া যায় না। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, শিগগিরই তিনি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করে ফেলবেন। মানুষ দেখছে উল্টোটা। বিদ্যুৎসঙ্কট এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শোচনীয়। প্রধানমন্ত্রী সে দিন বলেছেন, ‘এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করলাম তা যেন চোখেই পড়ে না।’

বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্তরালে
মন্ত্রীরা বলেছিলেন, মানুষ বেশি করে, তিনবারের বদলে চারবেলা খাচ্ছে বলেই খাবারের দাম বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ তো আর খাবার জিনিস নয় যে, বেশি করে খাবে! আর মওজুদ করে রাখার সামগ্রীও নয় বিদ্যুৎ। তা হলে ‘এত বিদ্যুৎ’ গেল কোথায়? লোকে কিন' বলে অন্য কথা। আসলে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কতগুলো বাণিজ্যিক গ্রুপকে ২০ হাজার কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট দেয়া হয়েছে বিনা টেন্ডারে। জানা গেছে, এসব গ্রুপের কোনো কোনোটির মালিক প্রধানমন্ত্রীর কাছের আত্মীয়, অন্যরা আওয়ামী লীগের মহারথী। সরকারি কোষাগার ফতুর করে দেয়া সে টাকা এরাই লুটেপুটে খাচ্ছে। এদের জন্য মনে হয়, প্রধানমন্ত্রীর দয়ার সীমা নেই। আকাশচুম্বী দুর্নীতি চলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেলায়। জোর গুজব, এই দুর্নীতি সম্বন্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন বলেই সাংবাদিক দম্পতি মেহেরুন রুনি আর সাগর খুন হয়েছেন। খুনিদের গ্রেফতারে সরকারের অনীহা এসব গুজবকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। খুনিদের ধরার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে নিয়েছেন। তাতে ফল হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন চা-বিস্কুট খাইয়ে সাংবাদিকদের আর কত দিন শান্ত রাখবেন?
মজার ব্যাপার দেখুন! তিতাস নদীর স্রোত বন্ধ করে সে নদী আর শাখা নদী ও খালগুলোতে বাঁধ দেয়া হলো। কারণ? কারণ এই যে, ভারত আগরতলায় বড় আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা তৈরি করবে, সে কারখানার জন্য বিরাট আর ভারী যন্ত্রপাতি নিতে হবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। ১৩৪ চাকার বিশাল ট্রেইলারে করে সেসব যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন' বাংলাদেশের পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করা হয়নি। তারপর শোনা গেছে, বাংলাদেশ সে কারখানা চালু রাখার জন্য গ্যাস দেবে আর সে কারখানা থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেবে। সে রকম কারখানা কি বাংলাদেশে তৈরি করা সম্ভব ছিল না? বিশেষ করে জ্বালানি যখন দিতে হবে বাংলাদেশকে? একসময় বর্তমান বাংলাদেশ থেকে পাট নিয়ে ব্রিটেনের ডান্ডিতে চট তৈরি হতো, আর সে চটের থলির চালান যেত বাংলাদেশে। নব্য উপনিবেশবাদ দেখছি কি আমরা? 
ভারতের প্রতি হাসিনার ঔদার্যের অবধি নেই। সে দেশের উত্তর-পূর্বের সাতটি অঙ্গরাজ্য বঞ্চিত এবং ক্রুদ্ধ। পাকিস্তানি আমলে আমাদের যেমন বঞ্চিত ও শোষণ করা হয়েছে, তারাও অনুরূপ শোষণের শিকার হচ্ছে দিল্লির হাতে। তাদের রকমারি প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে পশ্চিম ভারতের কেরালা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও পাঞ্জাবকে শিল্পোন্নত করা হয়েছে। কিন' বিনিময়ে তারা পাচ্ছে যৎসামান্য। তারা এই শোষণযন্ত্র থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছে চার দশকেরও বেশি আগে। বস'ত তাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও পুরনো। 
ভারত সামরিক শক্তি দিয়ে (পাকিস্তানিদের মতো) ন্যায্য অভিযোগ ও অসন্তোষকে টুঁটি টিপে মারার চেষ্টা করছে। সে রাজ্যগুলোতে অস্ত্রশস্ত্র আর সৈন্য পাঠানোর সহজ পথ বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। ওদিকে অরুণাচলে বিস্তীর্ণ বিবদমান এলাকা দখলের জন্য চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাঁয়তারা হচ্ছে ভারতে। চীন যদি শিলিগুড়ি হয়ে সরু সংযোগ পথটি বন্ধ করে দেয় তাহলে উত্তর-পূবের সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তখন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ছাড়া এ রাজ্যগুলোতে যাতায়াতের অন্য কোনো পথ থাকবে না।

যা যা দেয়া হচ্ছে ভারতকে
হয়তো সে জন্যই ‘বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শ’ দিয়ে ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করেছিল। হাসিনাও সুদে-আসলে সে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করেননি। এশিয়ান হাইওয়ে যাওয়ার কথা ছিল টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ চীন পর্যন্ত। কলমের এক টানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সে পরিকল্পনা উল্টে দিলেন; বললেন যে, এশিয়ান হাইওয়ে দুই শাখায় বিভক্ত হবে; একটি যাবে বুড়িমারী থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আসামে; আবার দ্বিতীয় শাখাও শেষ হবে আসামে গিয়ে, বেনাপোল থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। যেন বাংলাদেশের জন্য এশিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে আসামে গিয়েই।
হাসিনা দিল্লিতে গিয়েছিলেন ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। বাংলাদেশের মানুষ শুনেছে, সেখানে অনেক চুক্তি করে এসেছেন তিনি। কিন' চুক্তির বিষয়বস', এমনকি সংখ্যাও বাংলাদেশের মানুষকে জানতে দেয়া হয়নি, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদেরও নয়। ভবিষ্যতেও যাতে কেউ জানতে না পারে, তার ব্যবস'া করার জন্য সংবিধানও পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে সরেজমিন যা ঘটছে, তার থেকে কিছু আঁচ-অনুমান বাংলাদেশের মানুষ করতে পারছে, অনেক কিছু দেখছেও তারা। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেল, সড়ক ও নদীপথে উত্তর-পূর্ব ভারতে যাওয়ার করিডোর এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর অবাধে ব্যবহারের অধিকার দিতে হাসিনা রাজি হয়ে এসেছেন। প্রয়োজনবোধে তিতাসের মতো অন্য নদীতেও তারা বাঁধ তৈরি করবে বৈকি! বিনিময়ে বাংলাদেশ কিছু পাবে না। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেছেন, ভারতের কাছে টাকা চাইলে আমরা অসভ্য হয়ে যাবো।’ ভারতের কাছ থেকে ‘বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শ‘ পাওয়ার এখতিয়ার শুধু শেখ হাসিনার।
কিছুকাল আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সফররত এক কর্মকর্তার কাছে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়। প্রমাণ হয় যে, সারা বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস'া তদারকির জন্য তিনি ড. ইউনূসকে উপযুক্ত ব্যক্তি মনে করেছিলেন। ড. ইউনূস বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতার (তার ও বাকি বিশ্বের জন্য) জন্য তিনি তাকে যথাযোগ্য ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। তবে ইউনূস বাংলাদেশের সেবা করাকেই শ্রেয় বিবেচনা করে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, বদান্যতার বেলায় বিদেশীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষপাতিত্ব। 
ইউনূসকে তিনি বাংলাদেশে তারই স'াপিত ও পরিচালিত গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার উপযুক্ত বিবেচনা করেননি। তাকে অত্যন্ত অশোভনভাবে নিজের গড়ে তোলা ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তখন শোনা গিয়েছিল, গ্রামীণফোনের ওপর প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর তার পৃষ্ঠপোষকদের কারো কারো লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের নতুন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে কমিটি গঠন করা হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সে কমিটির সদস্য হওয়ার জন্যও ইউনূসকে যোগ্য বিবেচনা করেন না। শেখ হাসিনা শাসিত বাংলাদেশে গ্রামের যোগী ভিখ্‌্ পাবে না। 

বিদেশে মর্যাদাহানি 
একটা কথা মনে রাখতে হবে, ড. ইউনূসের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর গাত্রদাহ শুরু হয় ইউনূস যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পান তখন থেকেই। শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার কর্মকর্তারা তার জন্য এক ডজনেরও বেশি ডক্টরেট খরিদ করেছিলেন। বর্তমান দফায় ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি তার জন্য একটা নোবেল পুরস্কার সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে কূটনীতিক পাঠিয়েছিলেন দেশে-বিদেশে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে তার পৈতৃক সম্পত্তি মনে করেন, তার মতে নোবেল পুরস্কারসহ এ দেশের প্রাপ্য সব কিছু তার নিজের হওয়া উচিত। অন্য কেউ বাংলাদেশের জন্য সম্মান নিয়ে এলে সেটাকে গৌরব ভাবতে তার কষ্ট হয়। ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তিতে নিজের মর্মবেদনা প্রধানমন্ত্রী এখনো ভুলতে পারেননি মনে হচ্ছে।
ইউনূসের প্রতি শেখ হাসিনার অন্যায্য আচরণ বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদায় যেন এক বোতল কালি ঢেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তিন নম্বর প্রধান কর্মকর্তা ওয়েন্ডি আর শেরম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ড. ইউনূসের প্রতি সরকারের আচরণ। অতি সত্বর গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগের তাগিদ দিয়েছেন শেরম্যান। ওয়াশিংটন স্পষ্টতই ভয় করছে, এই আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে শেয়াল-কুকুরে কামড়াকামড়ি হতে পারে। ইউনূসকে যথাযোগ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধও মিজ শেরম্যান প্রধানমন্ত্রীকে করে গেছেন বলে মনে করা হয়।
মিজ শেরম্যান প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে গোপন বৈঠকে আর যে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে মনে হয়, সেগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশে সব দলের যোগদানের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুনিশ্চিত করা। এটাও তিনি টের পেয়ে গেছেন যে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচন করলে তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। তেমন অবস'ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অথবা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশও স্বীকৃতি দিতে চাইবে না। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারকে এ বিষয়টা গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আগেও জানা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সম্বন্ধে ওয়াশিংটন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিএনপি ও সমমনা গণতান্ত্রিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকারে সরকার যেভাবে বাধা দিচ্ছে, সে বিষয়ে মার্কিন সরকারের অসন'ষ্টির কথাও ওয়েন্ডি শেরম্যান প্রধানমন্ত্রীকে বলে গেছেন। এই মার্কিন কর্মকর্তার সফরের কী প্রতিক্রিয়া হবে, সবাই সে দিকে দৃষ্টি রাখবে। 
লন্ডন, ০৮.০৪.১২
serajurrahman@btinternet.com